Supreme Court: ‘আপনারা ধরেই নিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী অপরাধ করেছেন’, বিচারপতিদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় কপিল সিব্বলের
IPAC case hearing in Supreme Court: বিচারপতির মন্তব্যের বিরোধিতা করে কপিল সিব্বল বলেন, "এটা ফ্যাক্ট নয়। এটা অভিযোগ। আপনি ধরেই নিচ্ছেন যে মুখ্যমন্ত্রী অপরাধ করেছেন।" তখন বিচারপতি মিশ্র বলেন, "আমরা কিছুই ধরে নিচ্ছি না। আমাদের ভুল বুঝবেন না। কোনও না কোনও ফ্যাক্টের উপর ভিত্তি করেই যে কোনও অভিযোগ করা হয়। যদি এক্ষেত্রে কোনও ফ্যাক্ট না থাকে, তাহলে এক্ষেত্রে তদন্তেরও প্রয়োজন নেই। তারা সিবিআই তদন্ত চাইছেন।"

নয়াদিল্লি: সুপ্রিম কোর্টে আইপ্যাক মামলার শুনানিতে বিচারপতিদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় আইনজীবী কপিল সিব্বলের। মঙ্গলবার মামলার শুনানিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী কপিল সিব্বল প্রশ্ন তোলেন, ইডি কীভাবে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে মামলা করে? তখনই বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্রের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় সিব্বলের।
শুনানি চলাকালীন কপিল সিব্বলের উদ্দেশে বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র বলেন, “আপনি বলছেন, ইডির তদন্ত চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী জোর করে তল্লাশির জায়গায় ঢুকে পড়লেন। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য প্রশাসনের দ্বারস্থ হতে হবে। আর তাঁরা বিচারের আশা করবেন? এটা ফ্যাক্ট যে মুখ্যমন্ত্রী জোর করে তল্লাশির জায়গায় ঢুকেছেন।”
বিচারপতির শেষোক্ত মন্তব্যের বিরোধিতা করে সিব্বল বলেন, “এটা ফ্যাক্ট নয়। এটা অভিযোগ। আপনি ধরেই নিচ্ছেন যে মুখ্যমন্ত্রী অপরাধ করেছেন।” তখন বিচারপতি মিশ্র বলেন, “আমরা কিছুই ধরে নিচ্ছি না। আমাদের ভুল বুঝবেন না। কোনও না কোনও ফ্যাক্টের উপর ভিত্তি করেই যে কোনও অভিযোগ করা হয়। যদি এক্ষেত্রে কোনও ফ্যাক্ট না থাকে, তাহলে এক্ষেত্রে তদন্তেরও প্রয়োজন নেই। তারা সিবিআই তদন্ত চাইছেন।”
গত ৮ জানুয়ারি লাউডন স্ট্রিটের বহুতলে আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশি চালায় ইডি। তল্লাশি চালানো হয় সল্টলেকে ইডির অফিসে। খবর পেয়ে প্রথমে প্রতীক জৈনের ফ্ল্যাটে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখান থেকে একটি সবুজ রঙের ফাইল ও একটি ল্যাপটপ নিয়ে বেরিয়ে আসেন। পরে সল্টলেকে আইপ্যাকের অফিসেও যান মুখ্যমন্ত্রী।
তল্লাশিতে বাধা দেওয়ায় মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মামলা দায়ের হয় শীর্ষ আদালতে। এদিন বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র ও বিচারপতি এনভি অঞ্জরিয়ার বেঞ্চে মামলার শুনানি হয়। এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে সওয়াল শুরু করেন কপিল সিব্বল। প্রথমেই তিনি বলেন, ইডি অফিসারদের বাধা দেওয়ার ঘটনায় তদন্তের ক্ষেত্রে প্রথম বিচার করতে হবে যে ইডির মৌলিক অধিকার আছে কি না। একজন ডেপুটি ডিরেক্টরের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু যেখানে এই তদন্ত চলছিল সেখানে উপস্থিতি ছিলেন না ডেপুটি ডিরেক্টর। তাহলে কীভাবে তাঁর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হল? এটা জনস্বার্থ মামলা নয়। রবিন বনসল নামে সেই ডেপুটি ডিরেক্টরকে জানাতে হবে যে তাঁর কোন মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। তিনি ওখানে উপস্থিত ছিলেন না।
এই মামলায় মৌলিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে সিব্বল বলেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের মামলা করতে গেলে জানাতে হবে যে কোন মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। প্রথম প্রশ্ন, মৌলিক অধিকার আছে কি না তা দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোন মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হল তা জানাতে হবে। ওই অফিসার অন্য অফিসারদের তল্লাশিতে যাওয়ার জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন।
ডেপুটি ডিরেক্টরের অনুপস্থিতি নিয়ে সিব্বল প্রশ্ন তুলতেই ইডির তরফে অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেল এসভি রাজু বলেন, ” উনি বলছেন ওই অফিসার ওখানে উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু তাঁর পজিশন কী ছিল, তা আমি বলব।”
সিব্বলের সওয়ালের পর বিচারপতি মিশ্র বলেন, হয়তো উনি একজন শ্যাডো অফিসার হিসেবে কাজ করছিলেন। তখন সিব্বল বলেন, “যদি রবিন বনসল অন্যদের তরফে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার মামলা দায়ের করেন। তাহলে তা বিচার্য হবে না। যদি তাঁর নিজের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন হয়ে থাকে, শুধু তাঁর আবেদনই এক্ষেত্রে বিচার্য হবে।” এরপরই তিনি বলেন, “এই রবিন বনসাল একজন কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার মামলা দায়ের করতে পারে। কিন্তু তারাও সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন হওয়ার মামলা দায়ের করতে পারে না।”
সিব্বলের সওয়াল শুনে বিচারপতি বলেন, “ওরা বলছেন আইনের শাসন লঙ্ঘন করা হয়েছে।” পাল্টা সিব্বল বলেন, “প্রশ্ন হচ্ছে আইনের শাসনের কোন ধারা প্রযোজ্য? কে তা কার্যকর করবে।” তারপরই সিব্বল বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও দফতর কোনও রিট পিটিশন ফাইল করতে পারে না। আর এক্ষেত্রে ইডি কোনও ডিপার্টমেন্টও নয়। এক্ষেত্রে ইডিকে আবেদনকারী করা হয়েছে, কারণ কেন্দ্রীয় সরকারকে আবেদন করতে হলে সংবিধানের ১৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী করতে হবে। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নয়।”
সিব্বল আরও বলেন, ওরা বলছে, রাজ্য পুলিশ যে তদন্ত করছে তা তারা করতে পারবে না। এ বিষয়ে একাধিক মামলার রায় রয়েছে। তখনই বিচারপতি মিশ্র বলেন, “আপনি বলছেন, ইডির তদন্ত চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী জোর করে তল্লাশির জায়গায় ঢুকে পড়লেন। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য প্রশাসনের দ্বারস্থ হতে হবে। আর তারা বিচারের আশা করবে?”
নিজের সওয়ালে সিব্বল বলেন, “যদি ইডি PMLA অনুযায়ী তদন্ত করে এবং যদিও অন্য কোনও অপরাধ সংঘটিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের রাজ্য সরকারকে জানাতে হবে। PMLA-তে অনুচ্ছেদ ৬৬ অনুযায়ী এই আইনি সংস্থানই আছে।” তখন বিচারপতি মিশ্র বলেন, “এক্ষেত্রে PMLA-র অনুচ্ছেদ ৬৬ প্রযোজ্য নয়। এক্ষেত্রে দুটি আলাদা আলাদা অভিযোগ আছে। এটা PMLA ইস্যু যা ইডি তদন্ত করছে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, PMLA মামলায় তদন্ত চলাকালীন যে ঘটনা ঘটেছে সেই অপরাধ প্রসঙ্গে অভিযোগ। পিএমএলএ তদন্তকারীদের বিরুদ্ধে এক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।”
সওয়াল করতে গিয়ে কপিল সিব্বল বলেন, “যদি কোনও রাজ্যে কোনও পুলিশ স্টেশন এলাকায় কোনও অপরাধের ঘটনা ঘটে, তাহলে তার তদন্ত সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারই করবে। এমনকি মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও এটাই আইন। এক্ষেত্রে প্রথমে মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন আসে না। যদি সেই অপরাধের তদন্ত না হয়, তখন তারা বলতে পারেন যে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।”
সিব্বলের সওয়াল শুনে বিচারপতি মিশ্র বলেন, “যে তদন্তকারী অফিসারদের বিরুদ্ধে এই ঘটনা ঘটেছে, তাঁদের মৌলিক অধিকারের বিষয় নিয়েই সওয়াল করুন। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ইডি-র উপরে কনসেনট্রেট করা হচ্ছে। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধের বিষয় নিয়ে বলা হচ্ছে না।”
পাল্টা সিব্বল বলেন, “যদি একজন অফিসারকে তাঁর কাজ করতে বাধা দেওয়া হয় তাহলে তাঁর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয় না। তাঁর আইনসিদ্ধ অধিকার লঙ্ঘিত হয়। তদন্ত করা কখনও মৌলিক অধিকার হতে পারে না। এটা আইনসিদ্ধ অধিকার। সেই অধিকার লঙ্ঘিত হওয়া মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ নয়। যদি এটাকে মান্যতা দেওয়া হয় তাহলে প্যান্ডোরা বক্স খুলে যাবে।”
সিব্বল নিজের সওয়ালে আরও বলেন, “ইডি ডিরেক্টরকে কেন্দ্রীয় সরকার নিয়োগ করেছে। এক্ষেত্রে ইডি ডিরেক্টরের মৌলিক অধিকার আইনি এক্তিয়ারের অন্তর্ভুক্ত নয়।” মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর ফের আইপ্যাক মামলা শুনবে সুপ্রিম কোর্ট।
