Bhowanipore: কাঁপা-কাঁপা হাতে আজও সুতো পরান, পায়ে সেলাই মেশিনের খটখট শব্দ,যদি অর্ডার আসে! যদুবাবুর বাজারের ঘুপচিতে কোনওমতে দিন কাটান ৯৫-এর বিমল
Kolkata: আশি বছর ধরে একটানা ঘুরে চলা সেই চাকা আজ বড় ক্লান্ত, তবু পেটের তাগিদে তাকে ঘুরতেই হয়। বিমলবাবুর এই জীর্ণ দোকানটি শুধু তাঁর কর্মক্ষেত্র নয়, এ এক অন্তহীন জীবনসংগ্রামের মঞ্চ, যেখানে সততাই শেষ সুর। জীবনের এই শেষপ্রান্তে এসে, একলা মানুষ আর তাঁর পোষ্য মিনুর সংসারে কি পৌঁছাবে কোনও সহানুভূতির আলো? নাকি সেলাই মেশিনের ক্লান্ত খটখট শব্দেই লুকিয়ে থাকবে এক বৃদ্ধের আজীবন লড়াইয়ের ইতিহাস?

কলকাতা: দিন বদলায়, আধুনিক রেডিমেড পোশাকের ভিড়ে হারিয়ে যায় পুরোনো দর্জিদের কদর, কিন্তু বদলায়নি ভবানীপুরের যদুবাবুর বাজারের এই চেনা দৃশ্যটি। আজও একলা ঘরে, একাকী এক বৃদ্ধের দিন কাটে কাপড়ের খটখট শব্দে।
বয়স ৯৫ বছর। যে বয়সে মানুষের বিশ্রামের প্রয়োজন, সেই বয়সেও খাটুনি থেকে রেহাই মেলেনি বিমলকান্ত দে মহাশয়ের। দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরের যদুবাবুর বাজারের কাছে একটি ছোট্ট ঘুপচি দোকানে আজও কাপড়ের টুকরো আর সুতো নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় তাঁকে। মাত্র ১২ বছর বয়সে মামার হাত ধরে শুরু হয়েছিল সেলাইয়ের কাজ।
আজ প্রায় ৮০ বছর পার হয়ে গেলেও একই সেলাই মেশিনের চাকা ঘুরিয়ে চলেছেন তিনি। এই ছোট্ট, ১০০ বছরের প্রাচীন সংকীর্ণ ও জীর্ণ দোকানটিই তাঁর কর্মক্ষেত্র, আবার এখানেই তাঁর ঘরবাড়ি।
এই বাড়িতেই তিনি ছোটবেলা থেকে ভাড়া থাকেন। তবে বর্তমানে বাড়ির মালিক তাঁর কাছ থেকে আর কোনও ভাড়া নেন না। কষ্টের সংসার চালানোর মাঝেও তাঁর সঙ্গী রয়েছে একটি পোষ্য বিড়াল, নাম তার ‘মিনু’। এই মিনুই এখন দোকানে তাঁর সারাক্ষণের একমাত্র সাথী।
জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে এবং দুমুঠো অন্নের সংস্থানে তাঁকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে। অল্প উপার্জন, তার ওপর শরীরে থাবা বসিয়েছে বার্ধক্যের ক্লান্তি।
বিমলবাবু বর্তমানে মাসে যা আয় করেন, তা দিয়ে তাঁর ওষুধ এবং সামান্য খাওয়াদাওয়াই কোনও মতে চলে। এই সামান্য টাকায় বর্তমান বাজারে সংসার চালানো তো দূর, নিজের বার্ধক্যজনিত রোগের সমস্ত ওষুধ কেনাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কাপড়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কাজ করার পরও তাঁর চোখের দৃষ্টি কিন্তু এখনও বেশ তীব্র। কাঁপা কাঁপা হাতে সূঁচে সুতো পরাতে এখনও তিনি অনায়াসে পারেন। শরীর এখন আর আগের মতো সায় দেয় না, হাত দুটোও অনবরত কাঁপে। তবুও পেটের তাগিদে যখনই পারেন, মেশিনের চাকা ঘোরান তিনি।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হল, এই বয়সে এসেও বিমলবাবু সারাক্ষণ দোকানের গেটের দিকে তাকিয়ে থাকেন—এই বুঝি নতুন কোনো অর্ডার এলো! আশেপাশের মানুষ জানিয়েছেন, সততার সাথে সারাজীবন কাজ করেছেন বৃদ্ধ বিমলবাবু।
আজও তিনি অত্যন্ত নিখুঁত ও ভালো কাজ করতে পারেন, তাঁর হাতের কাজের কদর এখনও কমেনি। ৯৫ বছরের বিমল বাবুর মুখে তাঁর এলাকার বিধায়ক তথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাজের প্রশংসা শোনা গেল।
আশি বছর ধরে একটানা ঘুরে চলা সেই চাকা আজ বড় ক্লান্ত, তবু পেটের তাগিদে তাকে ঘুরতেই হয়। বিমলবাবুর এই জীর্ণ দোকানটি শুধু তাঁর কর্মক্ষেত্র নয়, এ এক অন্তহীন জীবনসংগ্রামের মঞ্চ, যেখানে সততাই শেষ সুর। জীবনের এই শেষপ্রান্তে এসে, একলা মানুষ আর তাঁর পোষ্য মিনুর সংসারে কি পৌঁছাবে কোনও সহানুভূতির আলো? নাকি সেলাই মেশিনের ক্লান্ত খটখট শব্দেই লুকিয়ে থাকবে এক বৃদ্ধের আজীবন লড়াইয়ের ইতিহাস?
