
কলকাতা: কৃষিজমি রক্ষার আন্দোলন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সাফল্যের কারণ। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে তুমুল বিতর্কের মধ্যে বামেদের ভুল পদক্ষেপ-সহ নানা কারণে শেষমেশ সরকারই উল্টে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কেরিয়ারের সব থেকে বড় ব্রেক থ্রু, সেটাই তাঁর ‘রাজত্বকালের’ কালও হয়। কারণ বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর ‘রাজত্ব’কালে বাংলায় সে অর্থে কোনও বড় শিল্প আসেনি। আজ তাঁর রাজত্বপাট চুকেছে। এই পরিস্থিতিতে মমতাকে নিয়ে বলা প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কয়েকটি শব্দবন্ধ বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০০১ সালে একটি সাংবাদিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ‘ব্যক্তি’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে তাঁর কী চিন্তাভাবনা ছিল, তা ব্যক্ত করেন বুদ্ধবাবু। তাঁকে সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার রাজনীতিতে বিশাল শক্তিশালী মুখ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে যদি আপনাকে লিখতে বলা হত, তাহলে কী লিখতেন?
বুদ্ধবাবুর সাফ কথা, “আমি সাদা পাতা ছেড়ে দিতাম।” কেন? তাঁর বক্তব্য, “তৃণমূল সম্পর্কে লিখতে বললে, আমি দেড়শো শব্দের মধ্যে লিখতে পারি। ব্যক্তি সম্পর্কে লিখতে বললে, শূন্য খাতা ছেড়ে দেব। আমি ব্যক্তি হিসাবে লিখতাম না, আমি লিখতাম, তাঁর পলিসি, প্রোগ্রামস নিয়ে। এই দলটির কোনও মতাদর্শগত ভিত্তি নেই।”
বিরোধী দলনেত্রী থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক সংগ্রামী-লড়াকু ভূমিকায় দেখেছে বাংলা। এই ইন্টারভিউটি নেওয়া হয়েছিল ২০০১ সালে, তার আগে ১৯৯৯ সালে ভয়ঙ্কর বন্যায় রাজ্যবাসী বিপর্যস্ত হয়েছিলেন। সে সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল বুদ্ধবাবুকে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, মানুষের দুঃখের সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মমতা, চাকরি দিয়েছিলেন অনেককে।
বুদ্ধবাবুর সরাসরি উত্তর, “তিনি মানুষের পাশে দাঁড়াননি। তাঁর কথায়, “রাজ্য সরকার বন্যা করেছে বলে তিনি রাগ করে বসে ছিলেন। আর অপেক্ষা করছিলেন, ভাবছিলেন, কীভাবে ৩৫৬ ধারা বাংলায় জারি করা যায়।”
‘চাকরি দেওয়ার রাজনীতি’তেও কীভাবে বামেদের সঙ্গে তৃণমূলের আদর্শের তফাৎ, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বুদ্ধবাবু। তাঁর কথায়, “চাকরি দেওয়ার রাজনীতিটা ভাল নয়। কয়েকশো জনকে দিতে পারলাম, আর বাকিরা আমার দিকে তাকিয়ে থাকছে সেটা ভাল নয়। বরং আমি এমন কোনও উদ্যোগ নেব, যাতে অনেক ধরনের ছেলেরা চাকরি পেতে পারেন। ধরুন হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস করেছি। ডাউন স্ট্রিমে ৪০০ কারখানা হয়েছে। ১২ হাজার ছেলেমেয়ের চাকরি হয়েছে। আমি দাবি করব না, আমি চাকরি দিয়েছি।”
তৃণমূল সরকারের গোড়া থেকেই শিল্প বনাম জমি, এই সংঘাতের কোনও সমাধান হয়নি। বরং যে কোনওরকম জমি অধিগ্রহণ নিয়েই বিরূপ অবস্থান নিয়েছে তৃণমূল সরকার। আর তাতেই শিল্পের পথে কাঁটা! বর্তমান তরুণ সমাজের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে, বাংলায় শিল্প আসবে না। আর সেটাকে হাতিয়ার করেই এবার আসনে বিজেপি। কিন্তু গোটা প্রেক্ষিতে এখন ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে বাংলার প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধবাবুর কথা!