
কলকাতা: পুরনো নাকি নব্য তৃণমূল? কোন দিকে রয়েছেন দেব (Dev)? প্রশ্ন এখন এটাই। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরই ভাঙন ধরেছে তৃণমূল কংগ্রেসে। বিধায়ক থেকে সাংসদদের একটা বড় অংশই মুখ ফিরিয়েছে দল থেকে। তারা তৈরি করছে নতুন শিবির। আর এই শিবিরেই অভিনেতা-সাংসদ দেব (Dev)-ও ভিড়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সূত্রের খবর, সোমবারে দিল্লিতে ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের বৈঠক বসেছিল, সেখানে উপস্থিত ছিলেন দেবও। এমনকী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তাঁর সৌজন্য সাক্ষাৎ হয় বলেও খবর। আজ,মঙ্গলবার তাঁকেই দেখা গেল কোলাঘাটে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী(Suvendu Adhikari)-র প্রশাসনিক বৈঠকে। সেই বৈঠক থেকে বেরিয়েই আবার ১৮০ ডিগ্রি পাল্টি দেবের। বললেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি সারাজীবন তাঁর ভালোবাসা থাকবে। তিনি নতুন তৃণমূলে যাচ্ছেন না!” রাজনৈতিক মহলও এখন সংশয়ে পড়েছে দেবের অবস্থান নিয়ে।
এ দিন কোলাঘাটে প্রশাসনিক বৈঠক শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে দেব বলেন, “রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, দিদি যখনই প্রশাসনিক বৈঠকে ডাকত, আসতাম। শুভেন্দুদাও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং ঘাটাল নিয়ে যে সমস্যা আছে, তা বলার সুযোগ দিলেন।”
গতকাল শতাব্দী রায় সহ তৃণমূূলের একটা বড় অংশের সাংসদরা বলেছেন যে দিদি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) বদলে গিয়েছেন। তাঁদের কথা শোনা হত না। তবে ঠিক উল্টো সুর দেবের গলায়। তিনি এ দিন বলেন, “আমি এটা কখনও বলতে পারব না যে আগে বলার সুযোগ পাইনি। আগেও সুযোগ পেয়েছি, এখনও সুযোগ পেয়েছি। ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শুরু হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে, আমার বিশ্বাস বর্তমান সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর হাতে সেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। সাংসদের থেকেও বড় কথা হল আমি ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রের মানুষদের প্রতিনিধি। ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রের সবথেকে বড় কষ্ট হল এখানকার বন্যা। এর সবথেকে বড় সমাধান ছিল ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান। ২০১৪ সাল থেকে এই লড়াইটা চলছিল, ২০২৪ সালেও আমি যখন দাঁড়াব না, তখনও দিদি কথা দিয়ে কথা রেখেছিল। সবাই দেখেছি। অর্থবর্ষে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, কিন্তু এবার জনগণের মতামত সম্পূর্ণ আলাদা এসেছে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী এসেছেন। আমি ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসাবে এসেছিলাম। মুখ্যমন্ত্রী কথা দিয়েছেন যে ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান এই সরকার সম্পূর্ণ করবেই।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত প্রিয় পাত্র ছিলেন। সমস্ত বড় অনুষ্ঠানেই তাঁকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দেখা যেত। সেই দেবই কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে বিদ্রোহী সাংসদদের বৈঠকে হাজির ছিলেন বলে সূত্রের খবর। এই নিয়ে কুণাল ঘোষও আক্রমণ করতে ছাড়েননি। বলেছেন, “দেব এক নম্বর অভিনেতা । তবে ওর রাজনীতি নিয়ে আমার বক্তব্য ঠিক ছিল কি না তা নেত্রী আজ বুঝবেন নিশ্চই।”’
প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, দেবও কি পাল্টে গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে অভিনেতা-সাংসদ বলেন, “২০১৪ সাল থেকে আমায় দেখছেন। আমি প্রথম থেকেই সৌজন্যের রাজনীতি করি। এখন যদি কেউ বলে, দেব পাল্টে গিয়েছে, তা নয়। দেব পাল্টায়নি। দেব একটাই রাজনীতি করেছে, মানুষকে এক রাখার। ভালোবাসা দেওয়ার রাজনীতি করেছি। আমার মঞ্চ থেকে কাউকে আক্রমণ করিনি, অপমান করিনি। শুধু ভালোবাসার রাজনীতি করে এসেছি। আজও তাই করছি। নতুন তো কিছু করছি না। আমি এমন কোনও বক্তব্য রাখিনি বা কাজ করিনি ২০১৪ সাল থেকে, যাতে দলের নাম খারাপ হয়। ২০২৬ সালেও আমি এমন কোনও কাজ করিনি, যাতে আমায় যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের মনে হয় যে ভুল লোককে ভোট দিয়েছেন। তাদের হকের জন্য লড়াই করছি, আজও করছি। মুখ্যমন্ত্রী বলেওছেন যে এই বাজেটে ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের জন্য টাকা বরাদ্দ করা হবে।”
তবে দিল্লিতে যে বিদ্রোহী ২০ জন তৃণমূল সাংসদের বৈঠকে যোগ দিলেন? আজ মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকেও সামিল। তারপরও দেব কার্যত ডিগবাজি খেয়েই আজ বৈঠক থেকে বেরিয়ে বললেন, “আমার ভালোবাসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য সারাজীবন থাকবে। কাল থেকে নতুন তৃণমূলে যাচ্ছি না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতদিন বেঁচে আছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আছি। ভবিষ্যতে কী হবে, আমি এখনই কিছু বলতে চাইছি না। দিল্লিতে যদি গিয়ে থাকি বা আজকের বৈঠকে যদি উপস্থিত থাকি, সেটা তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ হিসাবে, ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসাবে এসেছি।”
তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের বৈঠকে নিশ্চয়ই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্তুতি করতে যাননি দেব, তাহলে আজ কেন আবার বলছেন, যতদিন মমতা থাকবেন, তাঁর সঙ্গেই আছেন, প্রশ্ন ওয়াকিবহাল রাজনৈতিক মহলের। ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে দেবের অবস্থান নিয়ে।
তবে দেব জানিয়েছেন যে গতকালের পর কথা হয়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন। দেবের কথায়, “আমি কোনও দিন বলতে পারব না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমার কথা রাখেননি, শোনেননি। আর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যেখানে আমার এত কথা শোনেন, কেন এটা আমি বলতে যাব? জুনদি বা অন্যান্যরা যে সুরে কথা বলছেন, আমি কেন ওই সুরে কথা বলতে যাব ? আমি দিদিকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি, চাই উনি সুস্থ থাকুন। কিন্তু তার সঙ্গে ঘাটালের মানুষের কাছে আমি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, যতদিন না ২০২৯ সাল পর্যন্ত পৌঁছচ্ছি, ততদিন এই লড়াইটা করে যেতে হবে আমাকে। সেগুলি তো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরেই করতে হবে। এ রাজ্যে যে প্রশাসনে থাকবে, মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকবে, তার সহযোগিতাতেই তো করতে হবে। সেটাই তো করছি”। রাজনৈতিক মহলের কথায়, দেব এ কূল-ও কূল- দুই কূলই বজায় রাখছেন।