
কলকাতা: আরজিকর কাণ্ড আর তিলোত্তমা আন্দোলন এ রাজ্যের অন্যতম প্রধান আলোচিত বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় করে দেওয়ার মতো ঘটনা। বিচারের দাবিতে পথে নেমেছিল নাগরিক সমাজ। তিলোত্তমার জন্য একের পর এক রাত দখল করেছিলেন মহিলারা। সেই তিলোত্তমা আন্দোলন যে এবারের বিধানসভা নির্বাচনের অন্যতম চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনি। বিশেষত রত্না দেবনাথ বিজেপির টিকিটে ভোটে লড়ায় আরও আলোচিত হয়ে পড়ে তিলোত্তমা আন্দোলন।
পানিহাটি, এবারের নির্বাচনে হটস্পট। ভবানীপুর ছাড়া আর যে কেন্দ্র নিয়ে উত্তাপ চড়েছে রাজ্যে। সেই পানিহাটিতে এবার বামেদের প্রার্থী কলতান দাশগুপ্ত। ছাত্র যুব আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই তরুণ মুখ কি এবারের নির্বাচনে বামেদের অন্যতম মুখ? অধিকাংশ বাম কর্মী সমর্থকরা তো অন্তত তেমনটাই ভাবছেন।
২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে সিপিএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় হয়ে উঠেছিলেন এ রাজ্যে বামেদের অন্যতম মুখ। নন্দীগ্রাম বিধানসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর শুভেন্দু অধিকারী দুই হেভিওয়েটের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন মীনাক্ষী। ফিকে হয়ে যাওয়া লাল একটা মুখ খোঁজার চেষ্টা করেছিল। আর তাতে মীনাক্ষীই হয়ে উঠেছিলেন ভরসা। তিন নম্বরে শেষ করলেও তাঁর উপর থেকে আস্থা হারায়নি আলিমুদ্দিন। এবারের নির্বাচনে উত্তরপাড়ায় লড়ছেন তিনি। প্রচারে চলছে জোর।
বামেদের একঝাঁক তরুণ মুখ এবারে প্রার্থী হয়েছেন। দীপ্সিতা ধর, ধ্রুবজ্যোতি সাহা, ময়ূখ বিশ্বাস, সপ্তর্ষি দেবরা লড়ছেন বিভিন্ন জায়গা থেকে। শতরূপ ঘোষ, সৃজন ভট্টাচার্যরা ভোটে না দাঁড়ালেও প্রচারে ছুটে বেড়াচ্ছেন সর্বত্র। আর এসবের ভিড়েই কলতান যেন হয়ে উঠেছেন বামেদের নতুন তারা।
প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হওয়ার পরদিন থেকেই নেমে পড়েছেন ভোটের ময়দানে। চষে ফেলেছেন পানিহাটির অলি-গলি। সাড়া পাচ্ছেন ঠিকই। মিটিং, মিছিলে বেশ ভাল সাড়া মিলছে। এমনকি পানিহাটির কলতানকে নিয়ে তৈরি হয়েছে আলাদা একটি গানও। ভোট বাক্সে কি তার প্রতিফলন হবে? অপেক্ষা ৪ মে-র।
বামেদের অন্দরমহলেও কলতান দাশগুপ্ত কি অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন? বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর উত্তর, “কোনও কোনও সময়ে নির্বাচনে কেউ কেউ মুখ হয়ে ওঠে। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন বউবাজার কেন্দ্রে (এখন চৌরঙ্গি) দাঁড়ান বিধানচন্দ্র রায়। বিপক্ষে প্রার্থী শ্রমিক নেতা মহম্মদ ইসমাইল। পোস্টাল ব্যালট গোনার আগে পর্যন্ত মহম্মদ ইসমাইল জিতে গিয়েছিলেন। অল্প ব্যবধানে এগিয়ে যান। পোস্টাল ব্যালট কাউন্টিং শেষে বিধানচন্দ্র রায় জেতেন ৪৮০ ভোটে। মহম্মদ ইসমাইল নির্বাচনে হারলেও, চরিত্র হয়ে গেলেন। কখনও কখনও এমনটা হয়। আরজি করের ঘটনা হৃদয়বিদারক। পানিহাটিতে ছাত্র যুব আন্দোলন থেকে উঠে আসা, তরুণ যোদ্ধা কলতানকে নিয়ে চর্চা হতেই পারে। অসম্ভব যেমনটা নয়, অস্বাভাবিকও নয়। তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন নির্যাতিতা পড়ুয়া চিকিৎসকের মা।”
পানিহাটির সিপিএম প্রার্থীর ঘনিষ্ঠ ছাত্রনেতা তথা এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য বলছেন, “একলব্যর মতো কেউ কেউ থাকে, কাব্যে উপেক্ষিত। তাদের কথা জানতে মানুষের সময় লেগে যায়। কলতানদা ছাত্রযুব সংগঠনে আমার মতো অসংখ্য কমরেডের নেতা ছিল। সামনে থেকে লড়ত। আজ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ও প্রার্থী হিসেবে সকলের ভালবাসা পাচ্ছে, দেখে খুব ভালো লাগছে। এই স্বীকৃতি ওর প্রাপ্য। ওর জেতাটা ভীষণ জরুরি, শুধু পানিহাটি নয়, সারা রাজ্যের খেটে খাওয়া মানুষের জন্যই।”
পানিহাটির বাম প্রার্থী কলতান তিলোত্তমা আন্দোলনের সময় সামনে থেকে লড়েছিলেন। এমনকি জেল হেফাজত পর্যন্ত হয়েছিল তাঁর। স্লোগানে স্লোগানে ভরে গিয়েছিল রাজপথ, ‘তিলোত্তমা হারবে না, কলতান থামবে না।’ তিলোত্তমার মায়ের বিরুদ্ধে লড়তে হলেও, পানিহাটির বাম প্রার্থী বারংবার বলেছেন, “লড়াইটা তিলোত্তমার মায়ের বিরুদ্ধে নয়। লড়াইটা উনি যে দলের হয়ে দাঁড়িয়েছেন, সেই দলের বিরুদ্ধে। এরই সঙ্গে লড়াইটা তৃণমূলের বিরুদ্ধে।”
পানিহাটির তরুণ সিপিএম প্রার্থী কি এবারে বামেদের প্রধান মুখ? কলতানের উত্তর, “মানুষ আসলে মুখ খুঁজছে তৃণমূল-বিজেপির দুর্নীতি, ষড়যন্ত্রর বিরুদ্ধে। যেভাবে দুর্নীতিগ্রস্তদের বাঁচানো হয়েছে গত কয়েক বছরে, তার বিরুদ্ধে মানুষ মুখ খুঁজছে। সেই মুখটা লাল ঝান্ডা হয়ে উঠবে বলেই, মানুষ তাদের চর্চায় এমনটা বলছেন। যে ভরসায় মানুষ তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিলেন বা তৃণমূলের দুর্নীতি আটকাতে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন মানুষ হতাশ হয়েছেন। যত বিজেপি ভোট পেয়েছে, তৃণমূলের চুরি, দুর্নীতি বেড়েছে। দুর্নীতিগ্রস্তরা জেলের বাইরে ঘোরাফেরা করছে কারণ সিবিআই, ইডি তদন্ত করতে পারেনি। মানুষ বিকল্প মুখ খুঁজছে। আর সেটা হল বামপন্থা।”