Dog bite treatment: কুকুর কামড়ালে আগে জোগাড় করুন বাসন মাজার সাবান, ভুলেও করবেন না এই কাজগুলো!
Rabies symptoms: কুকুর বা বেড়ালের কামড় কিংবা আঁচড় থেকে হতে পারে মারণ রোগ জলাতঙ্ক। চিকিৎসকদের মতে, র্যাবিস ভাইরাসের লক্ষণ শরীরে একবার প্রকাশ পেলে মৃত্যুও হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বে কঙ্গোর পরেই ভারতে প্রতি বছর সবচেয়ে বেশি মানুষ (প্রায় ২০ হাজারেরও ওপর) কেবল কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, যার মধ্যে একটি বড় অংশই নিষ্পাপ শিশু। কুকুর কামড়ালে কী কী করা উচিৎ?

রাস্তায় চলতে ফিরতে কিংবা বাড়িতে পোষ্যের সঙ্গে খেলতে গিয়ে হঠাৎ কামড় বা নখের আঁচড় খেয়েছেন? সাবধান! এই সামান্য অসাবধানতাই ডেকে আনতে পারে ‘জলাতঙ্ক’ বা ‘র্যাবিস’ (Rabies)-এর মতো এক মারাত্মক ভাইরাসের আক্রমণ। চিকিৎসকদের মতে, র্যাবিস ভাইরাসের লক্ষণ শরীরে একবার প্রকাশ পেলে মৃত্যু প্রায় ১০০% নিশ্চিত। বর্তমানে বিশ্বে কঙ্গোর পরেই ভারতে প্রতি বছর সবচেয়ে বেশি মানুষ (প্রায় ২০ হাজারেরও ওপর) কেবল কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, যার মধ্যে একটি বড় অংশই নিষ্পাপ শিশু। কুকুর কামড়ালে কী কী করা উচিৎ? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গাইডলাইনে কী বলা হয়েছে? সোশাল মিডিয়ায় জানালেন ড: স্বদেশ মান্না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গাইডলাইন অনুয়ায়ী
কুকুর, বেড়াল, শিয়াল, বেজি বা বাঁদরের মতো প্রাণী আঁচড়ালে বা কামড়ালে ঠিক কখন কী করতে হবে, তার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আক্রান্তদের তিনটি প্রধান ভাগে (Category) ভাগ করেছে:
ক্যাটাগরি ১: যদি কোনও পশু শুধুমাত্র অক্ষত চামড়া চেটে দেয় বা হালকা লালা লাগে, কিন্তু চামড়ায় কোনও দাগ, আঁচড় বা রক্তপাত না হয়। এক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের প্রয়োজন নেই। আক্রান্ত অংশটি রানিং ওয়াটারে সাবান দিয়ে ধুয়ে নিলেই হবে।
ক্যাটাগরি ২: যদি পশুর দাঁত বা নখের আঁচড় লাগে এবং চামড়ায় স্পষ্ট দাগ পড়ে, কিন্তু কোনও রক্তপাত না হয়। খালি চোখে রক্ত না দেখলেও চামড়ার ভেতরে ‘মাইক্রোস্কোপিক ইনজুরি’ হতে পারে। তাই অবিলম্বে সাবান জল দিয়ে জায়গাটি ধুয়ে নিয়ে জলাতঙ্কের ৫টি ইনজেকশনের সম্পূর্ণ কোর্স করতে হবে।
ক্যাটাগরি ৩: যদি পশু কামড়ে মাংস তুলে নেয়, গভীর ক্ষত তৈরি করে এবং ক্ষতস্থান থেকে রক্তপাত হয়। এছাড়া মাথা, গলা, বুক বা কাঁধের মতো শরীরের ঊর্ধ্বাংশে কামড়ালে তা সরাসরি ক্যাটাগরি ৩-এর আওতায় পড়ে। এক্ষেত্রে ৫টি টিকার পাশাপাশি অতি অবশ্যই ‘হিউম্যান র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিন’ (Rabies Immunoglobulin) ইনজেকশন ক্ষতস্থানের চারপাশে পুশ করতে হবে, যা মূলত সরকারি হাসপাতালেই বিনামূল্যে পাওয়া যায়।
কামড় বা আঁচড় লাগার সঙ্গে সঙ্গে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা (First Aid)
কোনও প্রাণী কামড়ালে হাসপাতালের দিকে ছোটার আগে বাড়িতেই প্রথম ১৫ মিনিট অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একটি কাজ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সঠিক উপায়ে করা এই একটি প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে ভাইরাসের তীব্রতা প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া সম্ভব:
রানিং ওয়াটারে ধোওয়া: ক্ষতস্থানটি কল ছেড়ে দিয়ে রানিং ওয়াটারে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট ধরে খুব ভালো করে ধুতে হবে।
সাবানের ব্যবহার: ধোওয়ার সময় সাধারণ কাপড় কাচার সাবান বা গায়ে মাখার সাবান ব্যবহার করতে হবে। সাবানের ক্ষার ভাইরাসের বাইরের চর্বির আবরণটিকে নষ্ট করে দেয়, ফলে ভাইরাসটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এরপর ক্ষতস্থানে ডেটল, স্যাভলন বা বিটাডিনের মতো অ্যান্টিসেপটিক সলিউশন লাগিয়ে নিতে হবে।
যা করবেন না: ক্ষতস্থানে ভুলেও কোনও লঙ্কা গুঁড়ো, চুন, বা অ্যাসিড জাতীয় জিনিস দেবেন না। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করা বা সেলাই করা (Stitch) একেবারেই উচিত নয়, কারণ সেলাই করলে ভাইরাস আরও গভীরে স্নায়ুর মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে পারে।
ইনজেকশনের রুটিন এবং জরুরি কিছু মেডিক্যাল তথ্য
জলাতঙ্কের ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে (ইনকিউবেশন পিরিয়ড) সাধারণত ১৫ থেকে ৯০ দিন সময় লাগতে পারে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এটি ১ থেকে ৪ বছর পর্যন্ত সময় নিতে পারে। তাই কামড় বা আঁচড় খাওয়ার পর দেরি না করে ৫ দিনের মধ্যে টিকা নেওয়া শুরু করা সবচেয়ে ভালো। মাংসপেশিতে (Deep Intramuscular) ডেল্টয়েড পেশিতে মোট ৫টি ডোজ নিতে হয়, ০ দিন (যেদিন প্রথম ইনজেকশন নিচ্ছে), ৩ নম্বর দিন, ৭ নম্বর দিন, ১৪ নম্বর দিন এবং ২৮ নম্বর দিন। ক্ষতস্থান যাতে বিশিয়ে না যায়, তার জন্য ডাক্তারের পরামর্শে টিটেনাস ইনজেকশন এবং অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া জরুরি।
আগে টিকা নেওয়া থাকলে আবার কামড়ালে কী করণীয়? বিগত ৩ মাসের মধ্যে টিকার সম্পূর্ণ ডোজ নেওয়া থাকলে নতুন করে ভ্যাকসিনের প্রয়োজন নেই। কিন্তু ৩ মাস থেকে ৫ বছরের মধ্যে আবার কামড়ালে অন্তত ৩টি বুস্টার ডোজ (০, ৩ ও ৭ নম্বর দিন) নিতে হবে। আর যদি ৫ বছরের বেশি সময় পার হয়ে যায় কিংবা আগের ভ্যাকসিনের কথা মনে না থাকে, তবে আবার নতুন করে পুরো ৫টি ডোজই নিতে হবে। গর্ভাবস্থায় এই আধুনিক ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ নিরাপদ, এটি প্লাসেন্টাল ব্যারিয়ার অতিক্রম করে না এবং গর্ভস্থ শিশুর কোনও ক্ষতি করে না।
জল দেখলে কেন ভয় পায় রোগী?
র্যাবিস মূলত একটি নিউরোট্রপিক ভাইরাস, যা সরাসরি মানুষের মস্তিস্ককে আক্রমণ করে ‘ভাইরাল এনসেফালাইটিস’ তৈরি করে। এই রোগের ৪টি স্টেজ রয়েছে। প্রথম স্টেজে কামড়ানোর স্থানে ভাইরাস চুপ করে বসে থাকে। দ্বিতীয় স্টেজে (প্রায় ৭ দিন পর) ক্ষতস্থানের চারপাশে লাল হওয়া, চুলকানি বা জ্বালা শুরু হয়। তৃতীয় স্টেজে ভাইরাস পেরিফেরাল নার্ভ ধরে ব্রেনের দিকে এগোতে থাকে এবং সাধারণ ফ্লু-এর মতো জ্বর, কাশি, গা ব্যথা ও বমি বমি ভাব দেখা দেয়।
চতুর্থ স্টেজে ভাইরাস ব্রেন সেলকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এর ফলে জল বা কোনও তরল খাবার গলার নিচে নামানোর পেশিগুলো মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়। জলপানের চেষ্টা করলেই ওই পেশিগুলোতে প্রচন্ড ‘স্প্যাজম’ বা যন্ত্রণাদায়ক সংকোচন-প্রসারণ হয় এবং তীব্র ব্যথা জাগে। এই তীব্র যন্ত্রণার কারণেই রোগী জল দেখলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি। এই চতুর্থ স্টেজ একবার চলে এলে পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত মাত্র একজনই (আমেরিকার জিনা জেসিয়া, ২০০৪ সালে বাদুড়ের কামড়ের পর) ‘মিলওয়াকী প্রোটোকল’ (রোগীকে ডিপ কোমায় পাঠিয়ে অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা) চিকিৎসার মাধ্যমে বাঁচতে পেরেছেন, যা এক অবিশ্বাস্য ব্যতিক্রম। পশুদের না মেরে, তাদের প্রতি মানবিক হয়ে এবং সঠিক সময়ে টিকাকরণ করালেই এই মারণ রোগকে সমাজ থেকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব।
