
স্বর্গে তখন ঘোর রাত। দেবতারা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নিয়ম অনুযায়ী মর্ত্যেও তখন পুজোপাঠ হওয়ার কথা নয়। অথচ ঠিক সেই সময়েই বেজে ওঠে ঢাক! ঘোর ঘুম থেকে অসময়ে জাগানো হয় মহাদেবীকে। কিন্তু কেন? রাবণ বধের সময় রামচন্দ্রকে সাহায্য করার জন্যই কি এই পুজো শুরু হয়েছিল? নাকি এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে পুরাণের আরও কোনও ঘটনা? ষষ্ঠীর সকালে বেলতলায় দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় শারদীয়া। কিন্তু কেন এই পুজোকে ‘অকালবোধন’ বলা হয়, তা নিয়ে পুরাণের পাতায় এক আশ্চর্য গল্পের সন্ধান মেলে।
মৎস্যপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ, শ্রীশ্রীচণ্ডী থেকে শুরু করে দেবীপুরাণ, কালিকাপুরাণ কিংবা দেবী ভাগবত, সর্বত্রই এই বোধনের উল্লেখ রয়েছে। কালিকাপুরাণ বলছে, রাবণ বধে রামচন্দ্রকে সাহায্য করার জন্যই এই রাতে দেবীর বোধন করেছিলেন স্বয়ং ব্রহ্মা। যদিও বাল্মীকি রামায়ণে রামচন্দ্রের দুর্গাপুজোর কোনও বিবরণ পাওয়া যায় না। সত্য যুগে রাজা সুরথ বসন্তকালে বা চৈত্র মাসে যে পুজো শুরু করেছিলেন, তা মূলত বাসন্তী পুজো নামেই পরিচিত। আর আশ্বিন মাসে অকালে যে পুজো হয়, তা হল শারদীয়া বা অকালবোধন।
কিন্তু অকাল কেন? হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী, বছর মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত, উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ণ। মাঘ থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত সময়কাল হল উত্তরায়ণ। উত্তরায়ণের এই ছয় মাস হল দেবতাদের দিন। অন্যদিকে, শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত চলে দক্ষিণায়ণ। পুরাণ মতে, এই সময়টি হল দেবতাদের রাত। শরৎকাল ঠিক এই দক্ষিণায়ণের মধ্যেই পড়ে। অর্থাৎ, উৎসবের এই আনন্দমুখর সময়ে দেবতারা আসলে ঘুমান। শাস্ত্র মতে এই সময়ে দেবপুজো করা যায় না। তাই পুজো করার জন্য দেব-দেবীকে জাগাতে হয়। সংস্কৃত ‘বোধ+অনট’ ধাতু থেকে ‘বোধন’ কথাটি এসেছে। এর অর্থ হল জাগরণ বা ঘুম ভাঙানো। আর ‘অকাল’ মানে অসময়। যেহেতু শরৎকালে অসময়ে ঘুমন্ত দেবীকে জাগিয়ে পুজো করা হয়, তাই এর নাম অকালবোধন।
শরৎকালে দেবীকে জাগানোর জন্য ব্রহ্মা দেবীস্তুতি শুরু করেছিলেন। পুরাণের গল্প বলছে, পুজো শুরুর আগে ব্রহ্মা মানসচক্ষে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখেন। তিনি দেখেন, সমুদ্রতীরে এক গভীর জঙ্গলে বেলগাছের নীচে ৮-১০ বছরের এক বালিকা আপন মনে খেলছে। সেই বালিকাই স্বয়ং গৌরী বা কন্যকা। ব্রহ্মা চোখ মেলতেই সেই রহস্যময়ী বালিকা বিল্ববৃক্ষে অর্থাৎ বেলগাছে মিলিয়ে যায়। তখন ব্রহ্মা স্থির করেন, এই বেলগাছের নীচেই দেবীর বোধন হবে। ব্রহ্মার ডাকে দেবী কুমারী কন্যার রূপে আবির্ভূতা হন। আজও সেই পৌরাণিক নিয়ম মেনেই ষষ্ঠীর দিন বেলতলায় দেবীর বোধন হয়।
ষষ্ঠীর ভোরে সূর্যোদয়ের পর শুরু হয় কল্পারম্ভ। আর গোধূলি বা সন্ধ্যায় হয় বোধনের পুজো। গোটা পুজো পর্বে যাতে কখনও কোনও বাধা না আসে, তার জন্য দেবীর কাছে প্রার্থনা জানানো হয়। মণ্ডপের কোণে জলে পূর্ণ একটি তামার ঘট স্থাপন করে সেখানে দুর্গা ও চণ্ডীর পুজো হয়। বোধনের পর বেল শাখার দেবীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এরপর ঘটের চারপাশে তিরকাঠিতে সুতো জড়িয়ে আমন্ত্রণ প্রক্রিয়া শেষ হয়। এ ভাবেই সম্পন্ন হয় ষষ্ঠীর আচার।
পারিবারিক পুজোয় বোধনের মূলত দুটি ভাগ দেখা যায়। নবম্যাদি কল্পারম্ভে কৃষ্ণপক্ষের নবমী থেকে শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী পর্যন্ত ১৩ দিনের পুজো চলে। আর প্রতিপদাদি কল্পারম্ভে পুজো হয় ৬ দিন (মহালয়ার পরদিন থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত)। তবে বারোয়ারি বা সর্বজনীন মণ্ডপে ষষ্ঠীর দিনেই যে বোধন সারা হয়, তার নাম ‘ষষ্ঠ্যাদি বোধন’। এই ষষ্ঠীর দিনেই লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক ও সরস্বতীকে সঙ্গে নিয়ে মর্ত্যে আসেন দেবী দুর্গা। আর এই বোধন দিয়েই শুরু হয়ে যায় বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের আনন্দযজ্ঞ।