কেন সন্তানের মঙ্গলে নীলষষ্ঠী উপোস করেন মায়েরা? জেনে নিন ব্রত পালনের পৌরাণিক কাহিনী ও নিয়মাবলী

শোনা যায়, দক্ষযজ্ঞে সতী দেহত্যাগ করার পর নীলধ্বজ রাজার বিল্ববনে পুনরায় আবির্ভূত হয়েছিলেন। রাজা তাঁকে নিজের কন্যার মতো বড় করে তোলেন এবং মহাদেবের সঙ্গে বিয়ে দেন। কিন্তু বাসর ঘরেই নীলাবতী মৃত্যুবরণ করেন। এই শোকে রাজা-রাণীও প্রাণ বিসর্জন দেন। অনেকে মনে করেন, শিব ও নীলাবতীর এই বিবাহের স্মৃতিতেই নীলপুজো হয়ে আসছে।

কেন সন্তানের মঙ্গলে নীলষষ্ঠী উপোস করেন মায়েরা? জেনে নিন ব্রত পালনের পৌরাণিক কাহিনী ও নিয়মাবলী
Image Credit source: AI

Mar 27, 2026 | 2:43 PM

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর এই উৎসবের তালিকায় চৈত্র মাস এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। নীলপুজো বা নীলষষ্ঠীর দিন। তীব্র দাবদাহের মাঝেও মায়েরা নির্জলা উপোস করেন শুধুমাত্র সন্তানের দীর্ঘায়ু আর মঙ্গল কামনায়। ২০২৬ সালে নীলষষ্ঠী কবে পড়েছে, আর কেনই বা এই ব্রত এত গুরুত্বপূর্ণ, চলুন দেখে নেওয়া যাক।

নীলষষ্ঠী ২০২৬-এর নির্ঘণ্ট
সাধারণত চৈত্র সংক্রান্তির ঠিক আগের দিন অর্থাৎ চড়ক উৎসবের আগের দিন নীলপুজো পালন করা হয়। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ১৩ এপ্রিল (২৯ চৈত্র) সোমবার পড়েছে নীলষষ্ঠী। এদিন সন্ধ্যাবেলাই মূলত শিবের মাথায় জল ঢেলে ব্রত পালনের নিয়ম পালন করেন মায়েরা।

কেন মায়েরা নীলষষ্ঠী করেন?

নীলষষ্ঠী পালনের পেছনে একাধিক পৌরাণিক ও লৌকিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে দুটি গল্প সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়:

শিব-নীলাবতীর পরিণয়: শোনা যায়, দক্ষযজ্ঞে সতী দেহত্যাগ করার পর নীলধ্বজ রাজার বিল্ববনে পুনরায় আবির্ভূত হয়েছিলেন। রাজা তাঁকে নিজের কন্যার মতো বড় করে তোলেন এবং মহাদেবের সঙ্গে বিয়ে দেন। কিন্তু বাসর ঘরেই নীলাবতী মৃত্যুবরণ করেন। এই শোকে রাজা-রাণীও প্রাণ বিসর্জন দেন। অনেকে মনে করেন, শিব ও নীলাবতীর এই বিবাহের স্মৃতিতেই নীলপুজো হয়ে আসছে।

মা ষষ্ঠীর নির্দেশ ও বামুন-বামুনীর গল্প:

অন্য একটি কাহিনী অনুযায়ী, এক বৃদ্ধ বামুন ও বামুনীর সন্তানরা বারবার মারা যাচ্ছিল। শোকে কাতর হয়ে কাশীর ঘাটে বসে কাঁদছিলেন তাঁরা। তখন মা ষষ্ঠী এক বৃদ্ধার ছদ্মবেশে এসে তাঁদের নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করতে বলেন। তিনি জানান, চৈত্র মাস জুড়ে সন্ন্যাস পালন করে সংক্রান্তির আগের দিন উপোস করে শিবের মাথায় বাতি দিলে সন্তানরা দীর্ঘায়ু হবে। সেই থেকে আজও মায়েরা নিষ্ঠাভরে এই ব্রত পালন করে আসছেন।

ব্রত পালনের নিয়ম ও বিশেষ মুহূর্ত

নীলষষ্ঠীর দিনটি নির্দিষ্ট কোনও ক্ষণ মেনে হয় না, তবে সন্ধ্যার সময়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এদিন সারা দিন নির্জলা উপোস থাকতে হয়। সন্ধ্যাবেলায় শিবলিঙ্গে গঙ্গার জল, দুধ ও ঘি দিয়ে স্নান করাতে হয়। বেলপাতা, আকন্দ বা অপরাজিতা ফুলের মালা মহাদেবকে অর্পণ করতে হয়। সন্তানের নামে মন্দিরে বা বাড়ির শিব ঠাকুরের সামনে মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালানো অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।

খাওয়াদাওয়ার নিয়ম:
উপোস ভাঙার পরও চালের তৈরি খাবার খাওয়া বারণ। মূলত ফলমূল, সাবু বা ময়দার তৈরি খাবার যেমন লুচি বা পরোটা খাওয়া যায়। তবে নুন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ লবণের বদলে সন্দক লবণ বা সৈন্ধব লবণ ব্যবহার করাই দস্তুর।

বাঙালির এই বিশ্বাস আর ভক্তির উৎসব যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। সন্তানের সুস্থতা আর সুন্দর জীবনের প্রার্থনায় নীলষষ্ঠী আজও ঘরে ঘরে এক আবেগের নাম।

Follow Us