
কলকাতা : ইংল্যান্ড ইনিংসের বয়স তখন ১৪ ওভার। আগের ৩টে বল টানা ওয়াইড করে চতুর্থ বলও ওয়াইড ফুলটস করলেন অর্শদীপ। শট মেরে ৬ ভেবেই নিশ্চিত দাঁড়িয়ে উইল জ্যাক্স। হঠাৎ বাজপাখির মতো বাউন্ডারি লাইনে দুর্দান্ত ক্যাচ ধরলেন অক্ষর। মুহূর্তের মধ্যেই যেন জীবন ফিরে পেল শ্মশানপুরীর চেহারা নেওয়া ওয়াংখেড়ে। উল্লাসে সিট্ ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন গৌতম গম্ভীর। শেষবার তাঁকে এইভাবে উদযাপন করতে কে কবে দেখেছে ? টিভির সামনে বসা হাজার হাজার সমর্থকের সামনে তখন উৎকণ্ঠা। জেকব বেথেল তো তখনও ক্রিজে। ২৫৩ তুলেও তীব্র উৎকণ্ঠায় ভুগছেন দেড়শো কোটি ভারতীয়। অবশেষে পরিত্রাতা হয়ে উঠলেন ‘বুমবুম’ বুমরা। ১৮তম ওভারে উঠল মাত্র ৬ রান। সেখানেই হেরে গেল ইংল্যান্ড। ৭ রানে জিতে টানা দুইবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারত।
টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক। শুরু থেকেই ঝড় তুলেছিলেন আগের ম্যাচের নায়ক সঞ্জু। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে করেছিলেন ৯৭*, আজ করলেন ৮৯। আজকেও ফ্লপ অভিষেক (৯)। সঞ্জুর সঙ্গে মিলিয়ে দুরন্ত শুরু করলেন ঈশান কিষান (১৮ বলে ৩৯)। দুরন্ত খেললেন শিবম দুবেও (৪৩)। অধিনায়ক সূর্য আজ আবার ব্যর্থ (১১)। টানা ব্যর্থ হচ্ছেন অধিনায়ক। শেষের দিকে হার্দিক (২৭) ও তিলক (২১) না থাকলে আড়াইশো রানের গণ্ডি টপকাল ভারত। কুড়ি ওভার শেষে ভারত করল ২৫৩/৭। বিশ্বকাপের নক আউটে আজ সর্বোচ্চ রান করল ভারত। জোফ্রা আর্চার দিলেন ৪ ওভারে ৬১ রান। স্যাম কারান ৪ ওভারে ৫৩। লিয়াম ডসন ১ ওভারে ১৯। জবাবে ব্যাটে নেমে দ্বিতীয় ওভারেই আউট হয়ে যান ফিল সল্ট (৫)। অবশেষে দুই অক্ষরের রানের দেখা পেলেন জোস্ বাটলার। আজ করলেন ১৭ বলে ২৫। বরুণ চক্রবর্তীর বল বুঝতেই পারলেন না বাটলার। বল মিস করতেই সোজা উইকেটে লাগল বল। অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক করলেন ৭। তারপর থেকেই পুরো জেকব বেথেল শো। ২২ বছরের বেথেল আজ করলেন ৪৮ বলে ১০৫। যতক্ষণ তিনি ক্রিজে ছিলেন, ওয়াংখেড়েকে মনে হচ্ছিল অভিশপ্ত ১৯ নভেম্বর ২০২৩ এর আহমেদাবাদ স্টেডিয়াম, যেখানে একা ভারতের কাপ স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছিলেন ট্র্যাভিস হেড। ১৪ ওভারের মাথায় উইল জ্যাকসের (৩৭) দুর্দান্ত ক্যাচ নিলেন অক্ষর পটেল। সেখানেই যেন প্রাণ ফিরে পেল ওয়াংখেড়ে। স্যাম কারান চেষ্টা করলেও (১৮) ২৫৩ রানের পাহাড় চড়া সম্ভব হয়নি ইংল্যান্ডের। ১৮ তম ওভারে মাত্র ৬ রান দিলেন বুমরা। সেখানেই ম্যাচ ফস্কে গেল ইংল্যান্ডের হাত থেকে। শেষ ওভারে রান আউট হলেন বেথেল। তার আগেই তাঁর ব্যাট রীতিমতো প্রেশার বাড়িয়ে দিয়েছিল ভারতীয় সমর্থকদের। শেষ ওভারে জয়ের জন্য দরকার ছিল ২৯ রান। আর্চার তুললেন ২২। ৭ রানের জন্য ইতিহাসে নিজেদের নাম খোদাই করতে পারল না ইংল্যান্ড। ২৪৭/৭ রানেই থেমে যেতে হল তাদের। ম্যাচের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই চর্চায়, এই যে একদিনে প্রায় ৫০০ রান হল, এটা কি AI নাকি ঘোর বাস্তব ? ঘোর বাস্তব যে ভারতের বোলিংয়ে আজ বুমরা বাদ দিয়ে সবাই সাদামাটা ছিলেন।
আজ ওয়াংখেড়েতে যেন চাঁদের হাট বসেছিল। সস্ত্রীক ধোনি, সপরিবারে রণবীর কপূর, সপরিবারে অম্বানিরা, কে এল রাহুল, রোহিত শর্মা, অনিল কপূর – কে আসেননি ভারতের জয় দেখতে ? ভারতের সাফল্য উদযাপন করতে ? তাঁদের সামনেই ‘হিরো’ হয়ে যাচ্ছিলেন ২২ বছরের এক তরুণ, যাঁর মুখে দাড়ির রেখাও গজায়নি এখনও। ভারতের বিশ্বসেরা বোলিংকে নিয়ে ছিনিমিনি খেললেন বেথেল। বরুণ চক্রবর্তী ৪ ওভারে দিলেন ৬৪ রান। অর্শদীপ ৪ ওভারে ৫১। শিবম দুবে ১ ওভারে ২২। আগামী রবিবার ‘অপয়া’ নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামেই বিশ্বকাপ ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবেন সূর্যরা। তার আগে নিজেদের বোলিং নিয়ে যথেষ্ট কাজ করতে হবে ভারতকে। যেকোনও সময় ভারতের স্বপ্নকে দুঃস্বপ্ন বানানোর ক্ষমতা রাখেন টিম সেইফার্ট, ফিন অ্যালেনরা। আহমেদাবাদে কিন্তু ভারত ফাইনাল জেতেনা।