
কলকাতা : ১৮৫৬ সাল। লখনৌ শহর ছেড়ে শেষবারের মতো বেরিয়ে যাচ্ছেন নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ। গন্তব্য? কলকাতা। সেই সময়েই তিনি একটি কবিতা রচনা করেন, যার ভাষ্য খানিকটা এরকম, “যব ছোড় চলে লখনৌ নগরী, কেহতে হ্যায় হাল কে হাম পর কেয়া গুজরি!”। আজকের পর থেকে এই উক্তির নাম বদলে যদি যব ছোড় চলে আর্জেন্টিনা নগরী বলে দেওয়া যায়, খুব একটা ভুল হবে কি? কারণ, আজ ভারতীয় সময় ভোরে ফুটবল রাজপুত্র লিওনেল মেসিকে শেষবারের মতো নীল-সাদা জার্সিতে দেখে নিলেন ফুটবল সমর্থকরা। আর তিনি আসবেন না। আর তাঁর ম্যাজিকে মুগ্ধ হবে না গোটা বিশ্ব।
বেনিনের বিরুদ্ধে শেষবার মাঠে নামলেন মেসি। গোল করলেন, গোল করালেন, কাঁদলেন, কাঁদালেন। শেষ ম্যাচেও সপ্রতিভ ছন্দই দেখা গেল তাঁর পায়ে। সবাই তো জানত, আজকের দিন একদিন না একদিন আসবে। একদিন সব ঐশ্বর্য, রাজ্যপাট ছেড়ে চলে যাবেন রাজা। তিন পাতার একটি চিঠি দিয়ে জানিয়ে যাবেন নিজের প্রস্থানের খবর। জানাবেন, বিশ্বকাপ ফাইনালে হার, বাবার মৃত্যু কতটা মানসিক ব্যাঘাতে জর্জরিত করেছে তাঁর মননকে। কিন্তু আজকের দিন এল। তাই আর্জেন্টিনার জাতীয় সঙ্গীত চলাকালীন হাউহাউ করে কাঁদলেন মেসি। শুধু কি তিনি একাই কাঁদলেন? নাকি, তার সঙ্গে কেঁদেছেন তার বিশ্বব্যাপী সমর্থকরা?
তাঁর বিদায়ী ম্যাচের জন্য তৈরি করা হয়েছিল বিদায়ী জার্সি। নীল-সাদা জার্সিতে ছিল সোনালী রং। ম্যাচ শুরুর আগেই দেখানো হল সম্মান। ১০ নম্বর লেখা আর্জেন্টিনার একটি বিশাল জার্সি স্টেডিয়ামে টাঙানো হয়। মেসি মাঠে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আতশবাজির প্রদর্শনী শুরু হয়ে যায়। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী আন্তোনেলা, তিন ছেলে সিরো, থিয়াগো ও মাতেও। গোটা দেশজুড়েই তো ছিল একপ্রকার উৎসব। উন্মাদনা, আবেগ, ভালবাসা সবকিছুর কেন্দ্রে একজনই – মেসি। বিরুদ্ধে কারা? বেনিন, এমন এক দেশের নাম অতীতে কেউ শুনেছে কিনা সন্দেহ। এমনকি মেসির শেষ ম্যাচ বলে নাকি বিনা পয়সায় ম্যাচ খেলতে রাজি হয়ে গিয়েছে তারা।
ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় মেসির সম্মানার্থে বেশ কিছুক্ষন বন্ধ থাকে ম্যাচ। সবাই স্ট্যান্ডিং ওভেশন দেন লিওকে। যদিও প্রথমার্ধে কোনও গোল করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। কিন্তু বিরতির পরেই খোলে গোলমুখের দরজা। মেসির পাস থেকে দলকে এগিয়ে দেন নিকোলাস ওটামেন্ডি। ঘটনাচক্রে, নীল-সাদা জার্সিতে আজ শেষ ম্যাচ খেললেন তিনিও। ৬১ মিনিটের মাথায় মেসির অ্যাসিস্ট, নিকো পাজের গোল। তার মিনিট দশেক পর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ৭১ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি মেরে গোল করলেন মেসি। আর্জেন্টিনা জার্সিতে এল তাঁর ১২৬তম গোল।
মেসির শেষ ম্যাচে ৩-০ জিতে মাঠ ছাড়ল আর্জেন্টিনা। আর কি চাই? চাই তো অনেক কিছুই। পরীক্ষায় ভাল নম্বর, ভাল স্যালারি, সময়ে ঘুম, সুস্বাস্থ্য – কিন্তু জীবনের গোলমালে অনেক কিছুই পাওয়া যায় না। ঠিক যেমন, আর নীল-সাদা জার্সিকে পরিত্রান করতে দেখা যাবে না কোনও লিওনেল মেসিকে। আর কারও বাঁকানো শট গোলকিপারকে স্তব্ধ করে ঢুকবে না গোলে। আর কেউ বল পায়ে পেলেই কমেন্টেটর বলবেন না, ‘আংকারা মেসি’। চলে গিয়েছেন মারাদোনা, আজ চলে গেলেন মেসিও। ভবিষ্যতেও হয়ত আসবেন কেউ একজন, যিনি হয়তো ছাপিয়ে যাবেন মেসিকেও। কিন্তু মহীরুহের পতন ঘটানো কি এতটাই সহজ?