National Teachers Award 2026: জাপানের পড়ুয়াদের সঙ্গে আজ যোগাযোগ ঝাড়গ্রামের স্কুলের, ছকভাঙা শিক্ষাদানে নজির গড়ে জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার পাচ্ছেন ‘ভূগোল স্যর’ শান্তনু
Shantanu Patra National Teachers Award: জাতীয় শিক্ষকের পুরস্কার পাওয়ার কথা জানার পর প্রথম কেমন লেগেছিল তাঁর? প্রশ্ন শুনেই শান্তনু পাত্র বলেন, "যদি প্রত্যাশা থাকে তখন এক বিষয়। এই পুরস্কারের বিষয়ে আমার কোনও প্রত্যাশা ছিল না। যখন প্রথম শুনলাম, তখন শুধু চোখ দিয়ে জল বেরিয়েছে। একটা প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষা নিয়ে ভাবনাকে যখন সম্মান জানানো হয়, সেই স্বীকৃতিটা আমাকে আবেগ-আপ্লুত করে তুলেছিল। ফলে আমি শুধু কেঁদেছিলাম।"

ঝাড়গ্রাম: চক, ডাস্টার নিয়ে ক্লাসে শুধু পড়ানো নয়। শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়। শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হয়। এই ভাবনা মাথায় নিয়েই আঞ্চলিক ভাষা, লোকসংস্কৃতি ও আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে পাঠদান। সেই ভাবনাতেই শিক্ষাদান করে এবার ‘জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার’ পাচ্ছেন ঝাড়গ্রামের নয়াগ্রাম গভর্নমেন্ট মডেল স্কুলের ভূগোলের শিক্ষক শান্তনু পাত্র। ৫ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁর হাতে এই সম্মান তুলে দেবেন।
হুগলির তারকেশ্বরের বাসিন্দা শান্তনু ২০১৭ সাল থেকে নয়াগ্রামের স্কুলে কর্মরত। প্রকৃতির কোলে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি পটচিত্র, ঝুমুর ও বাহা গানের মাধ্যমে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জটিল বিষয় পড়ুয়াদের কাছে সহজ করে তুলেছেন তিনি।
পাশাপাশি স্কুলে গড়ে তুলেছেন ‘ডিজিটাল হাব’, ডিসকাশন প্ল্যাটফর্ম ও ক্রিয়েশন সেন্টার। বাবুই ঘাস ও তালপাতার সামগ্রী তৈরি এবং জৈব সার উৎপাদনের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে জাপান, অসম ও গুজরাটের স্কুলের পড়ুয়াদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের সুযোগও তৈরি করে দিয়েছেন তিনি। ছকভাঙা এই শিক্ষকের সাফল্যে গর্বিত স্কুল কর্তৃপক্ষ ও গোটা জেলা।
হাতে-কলমে শিক্ষার জন্য পড়ুয়াদের নিয়ে প্রকৃতির মাঝেই পৌঁছে যান শান্তনু। পরিবেশ রক্ষা, বন্যপ্রাণ রক্ষা, ভূমিক্ষয় রোধ এই সব বুঝিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি প্রাচীন কোনও স্থাপত্য বা মন্দিরে গঠন প্রণালী এবং কোন পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছে তাও বুঝিয়ে দেন পড়ুয়াদের। সেই বিষয়ে তিনি পরীক্ষাও নেন। তিনি লক্ষ্য করেন, পাঠ্যসূচির কড়া ভাষার পরিবর্তে পড়ুয়াদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতিতে পঠন-পাঠন করালে তাঁরা সহজেই তা বুঝে নিচ্ছেন।
পটচিত্রের মাধ্যমে বিষয়কে পড়ুয়াদের কাছে সহজলভ্য করে তোলা, পাশাপাশি ‘ডিজিটাল হাব’ তৈরি করে আধুনিক শিক্ষা প্রদান। ছক ভাঙা শিক্ষায় গড়ে তুলছেন পড়ুয়াদের। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে শান্তনু স্যর-ই আদর্শ। ঝাড়গ্রামের সেই শিক্ষক পাচ্ছেন জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার।
পুরস্কার পাওয়া নিয়ে কী বলছেন শান্তনু পাত্র?
এ বছর দেশের ৪৮ জন শিক্ষক এই পুরস্কার পাচ্ছেন। তার মধ্যে তিনি একজন। জাতীয় শিক্ষকের পুরস্কার পাওয়ার কথা জানার পর প্রথম কেমন লেগেছিল তাঁর? প্রশ্ন শুনেই শান্তনু পাত্র বলেন, “যদি প্রত্যাশা থাকে তখন এক বিষয়। এই পুরস্কারের বিষয়ে আমার কোনও প্রত্যাশা ছিল না। যখন প্রথম শুনলাম, তখন শুধু চোখ দিয়ে জল বেরিয়েছে। একটা প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষা নিয়ে ভাবনাকে যখন সম্মান জানানো হয়, সেই স্বীকৃতিটা আমাকে আবেগ-আপ্লুত করে তুলেছিল। ফলে আমি শুধু কেঁদেছিলাম।”
তাঁর পড়ানোর ভাবনা নিয়ে ভূগোলের এই শিক্ষক বলেন, “আমাদের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী থেকে আসছে। প্রত্যেকের চাহিদা আলাদা। সেজন্য প্রকৃতি, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে একটা পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। দেশের বিভিন্ন রাজ্য ও জাপানের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সংস্কৃতির বন্ধন তৈরির চেষ্টা করেছি। আসলে ছাত্রছাত্রীদের তো পড়ানো যায় না। শিক্ষক একটা শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। আমি সেই জ্ঞান অর্জনের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছি।” পুরস্কারের যে অর্থ পাবেন, তা স্কুলের ছাত্রদের প্রয়োজনেই ব্যয় করবেন বলে জানিয়ে দিলেন পড়ুয়াদের প্রিয় শান্তনু স্যর।
স্যরের পুরস্কার প্রাপ্তির খবরে খুশি পড়ুয়ারা। তাদের বক্তব্য, “স্যর খুবই ভালো পড়ান। আমাদের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গিয়ে সেখানকার সমস্ত কিছু হাতেকলমে শেখান। এসে পরীক্ষাও নেন।” খুশি স্কুলের সহ শিক্ষকরাও। তাঁরা বলছেন, “এটা আমাদের স্কুল ও জেলার জন্য গর্বের বিষয়। আমাদের স্কুলে যে ক্ষুদ্র কাজ হয়েছে, তা জাতীয় স্তরে স্বীকৃতি পাচ্ছে।”
