China: সুপার-পাওয়ার চিনের আসল ছবি দেখতে চান?
চিনে স্বাধীন গণমাধ্যম নেই। নেই মানুষের কাছে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকসেস। ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম-এক্স -- চিনে এসবের বালাই নেই। চিনা সরকারের 'গ্রেট ফায়ারওয়াল' সব সোশ্যাল মিডিয়াকে এতদিন ব্লক করে রেখেছিল। বিদেশি ওয়েবসাইট নিষিদ্ধ। তাই এতদিন সব ছবি প্রকাশ্যে আসেনি।

চিনের চোখ ধাঁধানো, চকচকে রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক গাঢ় অন্ধকার ও রূঢ় বাস্তব এবার বিশ্বের সামনে ফাঁস হয়ে গেল। সৌজন্যে ইলন মাস্কের এক্স ও মেটা-র ইনস্টাগ্রাম। বেজিংয়ের কড়া সেন্সরশিপ এবং ‘গ্রেট ফায়ারওয়াল’-এর নজরদারি এড়িয়ে এক্স ও ইনস্টাগ্রামে চিনের একের পর এক আসল ছবি ভাইরাল হচ্ছে । আধুনিক সুপার-পাওয়ার হিসাবে চিনের সরকারি মিডিয়া যে ভাবমূর্তির প্রচার করে, নেটিজেনদের সম্মিলিত চেষ্টায় তা আজ বড়সড় প্রশ্নের মুখে। অর্থনৈতিক মন্দা, ভেঙে পড়া পরিকাঠামো, সরকারের চরম দুর্নীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে তীব্র আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের সেই ‘অনফিল্টার্ড’ ও আসল সত্যিটা জানেন?
নামেই সুপার-পাওয়ার! আসলে ভিতরটা চূড়ান্ত ফাঁপা। একদিকে চিনা সরকারি মিডিয়া যখন আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, তখন‘জাতপাত ও চূড়ান্ত শ্রেণি বৈষম্যের জোড়া ফাঁসে চিনের প্রায় ৬০ কোটি গ্রামীণ মানুষ আধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে বঞ্চিত। মা-বাবার রোজগারের তাগিদে গ্রামে একা ফেলে রাখে প্রায় ৬ কোটি শিশুকে। অতি নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি বিশাল বিশাল সব বহুতল ও রাস্তাঘাট, অল্প দিনেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। মাইলের পর মাইল ভূতুড়ে ‘ghost cities’ খালি পড়ে রয়েছে। এটাই হল চিনের আসল ছবি। চিনা মিডিয়া ও সেন্সরশিপের ফাঁসা আলগা করে ভিতরের সেই সব শিউরে ওঠা ছবি এবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে। দেশি-বিদেশি মিডিয়া ফলাও করে সেই ছবিও ছাপছে।

ভুতুড়ে শহর
চিনা রোবট রেস্তোরাঁয় খাবার সার্ভ করছে। বেজিংয়ের সরকারি মিডিয়া এই ছবি সবাইকে দেখিয়েছে। কিন্তু যেটা দেখায়নি, সেটা হল রেস্তোরাঁর ব্যবহৃত বিষাক্ত ‘গাটার অয়েল’ (নর্দমার তেল) ছেঁকে নিয়ে পুনরায় রান্নার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। মারাত্মক সেই ভিডিও-ই এখন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল। অন্যদিকে চাকরির চেষ্টায় শহুরে হস্টেলে গাদাগাদি করে থাকছে সাধারণ ছাত্ররা। নর্দমার নোংরা গন্ধে টিকে থাকাই দায়। বড় শহরের ঠিক পেছনেই রয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্যের পাহাড়। ছয় ফুট বাই ছয় ফুটের ঘরে কোনওমতে বেঁচে থাকা। যেখানে খাওয়া, সেখানেই বাথরুম। ঘরে একটাও জানলা নেই। বিশেষত সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিম ও এথনিক বিভিন্ন গ্ৰুপের উপরে নির্বিচারে অত্যাচার। যখন তখন ধরপাকড়। আইনি সহায়তা ছাড়াই গ্রেপ্তারি।

নর্দমার তেল
তীব্র আর্থিক মন্দা এবং চাকরি থেকে তরুণদের রেকর্ড ছাঁটাইয়ের কারণে চিনে চরম হতাশা। আর্থিক অনটনের জন্য তরুণ প্রজন্মদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের রাস্তায় সাধারণ মানুষের ওপর ছুরি নিয়ে হামলা, ছিনতাইয়ের ঘটনা মারাত্মক বেড়ে গেছে। ক্রাইম রেট সর্বোচ্চ। এছাড়াও কম মজুরিতে জোর করে শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য করা, বাচ্চাদের আলাদা রেখে বাবা-মাকে লেবারের কাজে বাধ্য করা- এই নিয়েও গরিব মানুষের মনে ক্ষোভ চূড়ান্ত। বড় বড় কোম্পানি সপ্তাহে ৭৫ ঘণ্টা করে কাজ করিয়ে নেয় কর্মীদের দিয়ে। রয়েছে তীব্র শ্রেণি বৈষম্য-ও। শহুরে চিনে নিচু জাতের মানুষ স্কুল-কলেজ প্রবেশাধিকার পান না, পান না সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বা আবাসনে থাকার সুযোগ। একে বলে হুকোও সিস্টেম। নিচু জাতের চিনারা কোনও সরকারি সুবিধাই পান না। ফলে তীব্র রাগ-ক্ষোভে রাস্তাঘাটে উঁচুজাতের লোক দেখলে তাঁরা আক্রমণ করে বসেন। এমনকী নিচু জাতের চিনারা কোন ধরণের বাড়িতে থাকবেন, সেটাও সরকার ঠিক করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সব বাড়ি মানুষের বসবাসের অযোগ্য।

চিনে স্বাধীন গণমাধ্যম নেই। নেই মানুষের কাছে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকসেস। ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম-এক্স — চিনে এসবের বালাই নেই। চিনা সরকারের ‘গ্রেট ফায়ারওয়াল’ সব সোশ্যাল মিডিয়াকে এতদিন ব্লক করে রেখেছিল। বিদেশি ওয়েবসাইট নিষিদ্ধ। তাই এতদিন সব ছবি প্রকাশ্যে আসেনি। মানুষের উপরে সরকারের কড়া নজরদারি চলে। কমিউনিস্ট পার্টির বিরোধিতা করলে জেল যাত্রা বা উধাও হয়ে যায় খুব স্বাভাবিক ঘটনা। বিদেশি পর্যটকরা চিনে গেলে কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গাতেই ঘুরতে পারে। সেটাও সরকারি কর্মীর নজরদারিতে। চিনা কমিউনিস্ট সরকার ফেসিয়াল রিকগনিশন সফ্টওয়্যার ব্যবহার করে। প্রতি রাস্তার মোড়ে সিসি ক্যামেরা। সরকারের বেঁধে দেওয়া সীমার এদিক ওদিক গেলেই পর্যটকদের হয়রানি এমনকী পাসপোর্ট বাজেয়াপ্তের মতো ঘটনাও বেনজির নয়।

যতই চিনা সরকার চকচকে শহরের বিজ্ঞাপন দেখাক না কেন, ভাইরাল ভিডিও দেখাচ্ছে কীভাবে চিনে খালি পড়ে রয়েছে একের পর এক বহুতল। আবাসন খাতের নজিরবিহীন বিপর্যয় চলছে। গত দুই দশক ধরে চীনের মোট অর্থনৈতিক সম্পদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসত রিয়েল এস্টেট বা আবাসন শিল্প থেকে। অতিমাত্রায় ঋণ নিয়ে অতিরিক্ত বহুতল ভবন নির্মাণ করায় ২০২০ সালের পর থেকে এই খাতে তৈরি হওয়া ফাঁপা ভাব বা যাকে পোশাকি ভাষায় bubble বলে, সেটা ফেটে যায়। এভারগ্র্যান্ড -এর মতো শীর্ষ ডেভেলপার কোম্পানিগুলো দেউলিয়া হয়ে যায়। কোটি কোটি সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ করা টাকা আটকে গেছে। ফলে আবাসন খাতে বিনিয়োগ ২০২৫-২০২৬ সালে ১৫% থেকে ১৭%-এর বেশি কমে গেছে।
চিনে সাধারণ মানুষের খরচ না করার প্রবণতা বা মুদ্রাসংকোচন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। চাকরি নেই, বিনিয়োগ করা টাকা ডুবে যাওয়ায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে চীনের সাধারণ মানুষ এখন কেনাকাটা ও খরচ করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে দেশটিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। চাহিদা কম থাকায় পণ্যের দাম ক্রমাগত কমছে, যা অর্থনীতিতে ‘ডিফ্লেশন’ বা মুদ্রাসংকোচনের জন্ম দিয়েছে। দাম কমে যাওয়ার কারণে কোম্পানিগুলোর লাভ কমছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মচারীদের বেতনের ওপর। আবাসন খাত ধসে পড়ায় জমি বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে স্থানীয় প্রদেশের সরকারগুলি এখন লাখ লাখ কোটি টাকার ঋণের জালে জর্জরিত। অনেক প্রদেশে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বন্ধ বা কমিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন নাগরিক ভর্তুকিও তুলে নেওয়া হয়েছে।

বহু বছর ধরে চলা এক সন্তান নীতি’র প্রভাবে চীনের কর্মক্ষম যুবক-যুবতীর সংখ্যা দ্রুত কমছে। বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। অল্প বয়সী কর্মক্ষম মানুষের ওপর এখন বিশাল বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা ও চিকিৎসার দায়িত্ব এসে পড়েছে। এর ফলে যুবসমাজ সঞ্চয় করতে বাধ্য হচ্ছে, যা বাজারে টাকার ফ্লো কমিয়ে দিচ্ছে।
এই সবের পাশাপাশি চিনে আধমরা শিল্পের উপরে ট্রাম্পের শুল্ক খাঁড়ার ঘা তো রয়েছেই। চীনের উপর নির্ভরতা কমাতে অ্যাপল, স্যামসাংয়ের মতো বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি তাদের উৎপাদন কারখানা চীন থেকে সরিয়ে ভারত বা ভিয়েতনামের মতো দেশে নিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে তীব্র ট্যারিফ-ওয়ার। বাধ্য হয়ে চীন এখন সস্তা শ্রম ও রিয়েল এস্টেট নির্ভর পুরনো মডেল থেকে বেরিয়ে এসে প্রযুক্তি-নির্ভর (এআই) অর্থনীতিতে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। তবে এই সময়ে সাধারণ মানুষ তীব্র অর্থনৈতিক অনটন ও বেকারত্বের শিকার। যে কারণে চিনে এখন জিডিপি বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৪.৫% থেকে ৫%-এ নামিয়ে আনা হয়েছে, যা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
