Explained: মার্কিন স্যাটেলাইট খোঁজ-ও পাবে না মাটির এত নিচে লুকানো ইরানের মিসাইল সিটি
Iran’s Underground Missile Cities: এইসব ঘাঁটির উপরে গ্রানাইট পাথরের ঢিবি বা পাহাড় দিয়ে ঢাকা। ভিতরে সুড়ঙ্গের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত এই মিসাইল সিটি। এমনকী এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার জন্য রীতিমতো পাকা রাস্তা, সড়কপথও রয়েছে মাটির নিচেই। যাতায়াত করতে পারে আস্ত রেল। রেলের ওয়াগনে মিসাইল ঠাসা। মার্কিন ও ইজরায়েলি যুদ্ধবিমানের নজর এড়িয়ে সুড়ঙ্গের নিচ দিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইল।

ট্রাম্পের দাবি কি সত্যি? সত্যিই কি ইরানের সবচেয়ে লুকানো অস্ত্রভাণ্ডার, মাটির নিচে তাদের গোপন মিসাইল সিটি-তে চিড় ধরেছে? নাকি মাটির নিচের ইরানি মিসাইল ভাণ্ডার শেষ হয়ে আসছে? বিশেষজ্ঞরা কিন্তু বলছেন, এসবই ট্রাম্পের অলীক কল্পনা।
প্রায় এক মাস হতে চলা আমেরিকা-ইরান সংঘাত থামার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। বরং আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমণের ৮৫-তম ঢেউ শুরু করেছে তেহরান। মার্কিন ও ইজরায়েলি বায়ুসেনার হামলায় মাটির উপরে অবস্থিত ইরানের বহু মিসাইল লঞ্চার ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এখন তেহরানের আক্রমণের মেরুদণ্ড তার আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল সিটি। প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত ৫০-৬০টি ইরানি মিসাইল মাটির নিচ থেকে আচমকাই বেরিয়ে এসে তেল অভিভ বা মধ্য প্রাচ্যের কোনও না কোনও মার্কিন ঘাঁটিতে আছড়ে পড়ছে। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে প্রকাশ, ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কোর মাটির নিচে অন্তত ৩০টি মিসাইল সিটি বানিয়ে রেখেছে। সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে মার্কিন গোয়েন্দা মহলের শীর্ষ ৫ জন ব্যক্তি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এতদিনের লাগাতার হামলায় ইরানের মাত্র এক তৃতীয়াংশ মিসাইল-ই ধ্বংস হয়েছে। বেশিরভাগ মিসাইল এখনও অটুট। কেশম আইল্যান্ড, খোররোমাবাদ, খেররমশাহ, ইসফাহান, ওঘাবের মতো মাটির নিচে বড় বড় সেনা ঘাঁটি থেকে মার্কিন স্যাটেলাইটকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হামলার ঝাঁঝ বজায় রেখেছে ইরানি সেনা। শুধু মিসাইল নয়, প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের যুদ্ধবিমান ও বড় হামলাকারী ড্রোন ওড়ার মতো আন্ডারগ্রাউন্ড ফেসিলিটি এখনও অটুট। আর সেটাই ট্রাম্পের চোখ রাঙানির বিরুদ্ধে ইরানের নয়া সুপ্রিম লিডারের তুরুপের তাস হতে পারে এই যুদ্ধে।

এইসব ঘাঁটির উপরে গ্রানাইট পাথরের ঢিবি বা পাহাড় দিয়ে ঢাকা। ভিতরে সুড়ঙ্গের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত এই মিসাইল সিটি। এমনকী এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার জন্য রীতিমতো পাকা রাস্তা, সড়কপথও রয়েছে মাটির নিচেই। যাতায়াত করতে পারে আস্ত রেল। রেলের ওয়াগনে মিসাইল ঠাসা। মার্কিন ও ইজরায়েলি যুদ্ধবিমানের নজর এড়িয়ে সুড়ঙ্গের নিচ দিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইল। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের দাবি, এরকম ২৭টি আন্ডারগ্রাউন্ড ঘাঁটিকে যুক্ত করছে অন্তত ১০৭টি সুড়ঙ্গ। অলাভজনক সংস্থা অ্যালমা রিসার্চ ইন্সটিটিউট-এর দাবি, মার্কিন বোমারু বিমানের হামলায় এই সব সুড়ঙ্গে ঢোকা ও বেরোনোর রাস্তা ৭৭% নষ্ট হয়ে গিয়েছিল যুদ্ধের প্রথম ২ সপ্তাহেই। কিন্তু স্যাটেলাইট ছবি বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত সুড়ঙ্গপথগুলি দ্রুত সরিয়ে ফেলেছে তেহরান। তার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং গাড়ি, যন্ত্রপাতি। এক একটি ঘাঁটি মাটির নিচে অন্তত ৫০০ মিটার গভীরে। দ্রুত মিসাইল লঞ্চ করার মেকানিজম বা ‘কোল্ড লঞ্চ’ ক্ষমতা এখনও তেহরানের রয়েছে। ভাণ্ডারে ১ টন বিস্ফোরক বহনকারী খোররামশাহর-৪ মিসাইল এখনও ফুরিয়ে যায়নি। যার পাল্লা আবার প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার। দূরপাল্লার মিসাইল সেজ্জিল, খাইবার শেকন-ও মজুত বলে দাবি ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের। একইসঙ্গে এই আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি থেকে হঠাৎ হঠাৎ বেরিয়ে এসে উড়ে যাচ্ছে শাহিদ কামিকাজে ড্রোন, পাভে ও কাদর-৩৮০-র মতো ন্যাভাল ক্রুজ মিসাইল। নাম গোপন রাখার শর্তে এক প্রাক্তন মার্কিন মেরিন কোর রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরানের বুদ্ধিমানের মতো এই যুদ্ধে এখনই সব মিসাইল প্রকাশ্যে আনেনি।

মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রে খবর,
- যুদ্ধ শুরুর দিন থেকে আজ পর্যন্ত সবমিলিয়ে ১০ হাজারেরও বেশি ইরানি মিলিটারি টার্গেট ধ্বংস করা হয়েছে
- ইরানি নৌসেনার ৯২% জাহাজই হয় ডোবানো হয়তো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে
- কিন্তু মাটির নিচে কত ইরানি মিসাইল ও ড্রোন মজুত- জানেই না CIA
- ইজরায়েলি সেনার দাবি, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের অস্ত্র ভাণ্ডারে ২৫০০ ব্যালিস্টিক মিসাইল ছিল
- যুদ্ধে ৩৩৫-এরও বেশি ইরানি মিসাইল লঞ্চার ধ্বংস করা হয়েছে
- তবে ইরানের যুদ্ধের ক্ষমতা যে ফুরোয়নি সেটা স্পষ্ট
- শুধু UAE লক্ষ্য করেই এক মাস পরেও প্রতিদিন ১৫টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুঁড়ছে তেহরান
- সঙ্গে হামলার তীব্রতা বাড়াতে আরও ১১টি ড্রোন

মাত্র এক সপ্তাহ আগে ইরানি অস্ত্রভাণ্ডার থেকে বেরিয়ে এযাবৎকালের সবচেয়ে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল যা দিয়েগো গার্সিয়ায় মার্কিন সেনাঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্তা মেজর জেনারেল জিডি বক্সীর মতে, ইরানকে দেওয়া ডেডলাইনের সময়সীমা বাড়ানোর মানে ট্রাম্প নিজেই এখন দম নেওয়ার ফুরসৎ খুঁজছেন। কারণ, আমেরিকা ও ইজরায়েলে-দুজনের অস্ত্রভাণ্ডারই ফুরিয়ে এসেছে। মার্কিন ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজের কামানগুলিকে রিলোড করতে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সময় লাগবে। USS ফোর্ড ও লিঙ্কন দুই এয়ারক্রাফট কেরিয়ার-ই ইরানি মিসাইল ও ড্রোন হামলায় বিপর্যস্ত। ট্রাম্প নিজে ইরানে পদাতিক বাহিনী পাঠানোর কথা বললেও মার্কিন সচির জি-৭ বৈঠকে সে নিয়ে উচ্চবাচ্য করছেন না। ইজরায়েলের নেভাতিম বায়ুসেনা ঘাঁটিতে মোতায়েন স্টেলথ ফাইটার জেট এফ-৩৫-কে পর্যন্ত ইরানি ড্রোনের আঘাত সহ্য করতে হয়েছে। হাইফা, তেল অভিভ, দিমোনা– ইরানি মিসাইল হামলা কাউকে ছাড়ছে না। নেতানিয়াহুর সেনা পর্যন্ত কনফিডেন্স হারাচ্ছে ইরানি সেনার হার না মানা মনোভাবের কাছে।
ইরানি সেনা ও ইসলামিক রেভোলিওশনারি গার্ড কোর বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজেস্কি মনে করছেন, ৯৯% ইরানি মিসাইল ধ্বংসের যে দাবি ট্রাম্প করেছেন, সেটা ভিত্তিহীন। ইরানি সেনার হামলার ক্ষমতা যে এখনও অটুট রয়েছে সেটা শুধু তেহরানের পশ্চিমের বিড কানেহ মিলিটারি ফেসিলিটি থেকে হামলার বহর দেখলেই স্পষ্ট। যুদ্ধের মধ্যে মার্কিন সেনা এই ঘাঁটিতে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছিল। কিন্তু ২৪-৭২ ঘন্টার মধ্যে ওই ঘাঁটি সরিয়ে প্রতিদিন ইরান অন্তত আধডজন করে মিসাইল শুধু ওই ঘাঁটি থেকেই ছুঁড়ছে। পেন্টাগনের এক শীর্ষ কর্তার গলায় এখন খানিকটা হতাশার সুর। তাঁর বক্তব্য, গত এক মাসে ৮৫০-এরও বেশি টোমাহক মিসাইল ছুঁড়েছে আমেরিকা। তা সত্ত্বেও ইরানের আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল সিটি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত, সে বিষয়ে CIA-র কাছে কোনও নির্দিষ্ট তথ্যই নেই। উল্টে ইরান রোজ নিয়ম করে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখে ট্রাম্পকে এমন শিক্ষা দেওয়া হবে যে আর কোনওদিন আগে বাড়িয়ে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেবেন না কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
