
রুপোলি পর্দার তারকাদের সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকাই শ্রেয়— এই তত্ত্বে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন মহানায়ক উত্তম কুমার। তাঁর মতে, অভিনেতা যদি ঘন ঘন জনসমক্ষে আসেন, তবে তাঁর প্রতি দর্শকের সেই ‘ক্রেজ’ বা টান আলগা হয়ে যায়। একবার তো সহকর্মী শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়কে পেট্রল পাম্পে গাড়ি থেকে নামতে দেখে রীতিমতো কড়া শাসন করেছিলেন তিনি। আসলে ‘ম্যাটিনি আইডল’-এর খ্যাতির বিড়ম্বনা ছিল মারাত্মক। যেখানেই উত্তম কুমার, সেখানেই জনসমুদ্র। কিন্তু গণতন্ত্রের উৎসবে তো রাজা-প্রজা সবাই সমান! তবে ভোট দেওয়ার সময় সেই ভিড় সামলাতেন কীভাবে মহানায়ক?
পারিবারিক সূত্র থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, উত্তম কুমার কখনওই সাধারণ মানুষের মতো বুথে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতেন না। জনবিস্ফোরণ আর বিশৃঙ্খলা এড়াতে তাঁর জন্য ছিল এক বিশেষ রাজকীয় ব্যবস্থা।
উত্তম কুমার একসময় পোর্ট ট্রাস্টের কর্মচারী ছিলেন। সরকারি কর্মীদের যেমন পোস্টাল ব্যালটের সুবিধা থাকে, সেই নিয়মেই প্রথম দিকে তিনি ভোট দিতেন। কিন্তু পরবর্তীতে অভিনয়ের নেশায় চাকরি ছাড়লেও তৎকালীন সরকার তাঁর এই বিশেষ সুবিধাটি বহাল রেখেছিল। কারণটা ছিল সম্পূর্ণ নিরাপত্তাজনিত। প্রশাসনের আশঙ্কা ছিল, মহানায়ক যদি সাধারণ বুথে ভোট দিতে আসতেন, তবে তাঁকে একঝলক দেখার হুটোপুটিতে বড়সড় কোনও দুর্ঘটনা বা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারত। সেই বিশৃঙ্খলা রুখতেই খামে ভরে মহানায়কের ভোট সংগ্রহের প্রক্রিয়া জারি রাখা হয়েছিল।
আজকের যুগে ছবিটা অনেকটা বদলেছে। এখনকার টলিউড বা বলিউডের তারকারা শুধু ভোট দিতেই যান না, অনেকে সরাসরি রাজনীতির ময়দানে লড়াই করছেন। বর্তমান লোকসভা ভোটের আবহেও আমরা দেখছি তারকারা বুথে লাইনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন। কিন্তু সেই সময়ে গ্ল্যামার আর সাধারণ জীবনের মধ্যে যে লক্ষ্মণরেখা উত্তম কুমার টেনে দিয়েছিলেন, তা আজও বিস্ময় জাগায়। প্রচারের আলোয় থেকেও নিজেকে আড়ালে রাখার এই কৌশলই হয়তো তাঁকে বাঙালির চিরকালীন ‘মহানায়ক’ করে রেখেছে।