‘কাজ ফুরলে বুম্বাদা ছাড়া বাকি হিরো আর আমাদের চিনতেই পারে না’
প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুভয়, হিরোর জন্য জীবন বাজি রেখে লড়েন ওঁরা, পরিবর্তে মেলে কি প্রাপ্য? টলিপাড়ার স্টান্টম্যানদের কাহিনী এক্সক্লুসিভলি টিভিনাইন বাংলা ডিজিটালে ...

বিহঙ্গী বিশ্বাস
‘ওরা কাজ করে, দেশে দেশান্তরে…পাঞ্জাবে বোম্বাই গুজরাটে’— দিন কয়েক কাজে বেরতে পারেননি সাগর মাহাতো। ১৪টা সেলাই পড়েছে পায়ে। টলিউডের নামী হিরোর ডামি হতে গিয়ে ৬৪ টা সেলাই নিয়ে ২৫ দিন হাসপাতালে বিছানা আঁকড়ে ছিলেন বিমল রায়। নাসিরুদ্দিন শাহের এক ছবির বাইক স্টান্ট করতে গিয়ে চিত্ত কবিরাজের শরীর থেকে খুবলে যাওয়া মাংসের ক্ষতের দাগ আজও মেলায়নি। তবু ‘ওরা কাজ করে’। ‘গল্পে উপেক্ষিত’ সেই সব আনসাং হিরোদের নায়কোচিত কাজকর্মের দলিল, ইতিহাস আপন করে না। ঠিক যেমন তাঁদের নাম মনে রাখার দায়ও নেই কারও… ওদের কারও পোশাকি নাম ‘ডামি’, কেউ ‘স্টান্টদাদা’, ভাগ্য খানিক সহায় হলে ডাকা হয় ‘ফাইট মাস্টার’ বলে।
১ মে, শ্রমিক দিবস- শ্রমিকের অধিকার নিয়ে যখন চারিদিকে চলবে হইচই, বিপ্লবী মন লিখে ফেলবে তিন পাতার ফেসবুক পোস্ট, ঠিক সেদিনও কাজে যাবেন চিত্ত কবিরাজের মতো স্টান্ট দাদারা। হিরোর মতো জামা পরে ফ্লাইওভারে চালিয়ে দেবেন দুরন্ত গতির বাইক। স্ত্রীর দুশ্চিন্তা, সন্তানের উৎকণ্ঠা আর জীবনের ঝুঁকিকে গিলে ফেলে সমাজের চোখে হিরোকে করে তুলবেন ‘মাচো’… ক্লান্ত শরীরে সারাদিনের পরিশ্রমের পর ‘আইডিন্টিটি ক্রাইসিস’ কি গ্রাস করবে তাঁদের? টিভিনাইন বাংলা কথা বলেছিলেন এমনই এক মানুষের সঙ্গে যাকে আপনি সিনেমার পর্দায় দেখেছেন অনেকবারই। তবে তাঁকে কখনও জিৎ, কখনও প্রসেনজিৎ, কখনও আবার দেব ভেবে ভুল করেছেন। নাম তাঁর চিত্ত কবিরাজ। পরিচয়, টলিপাড়ার পরিচিত ফাইট মাস্টার।
জন্মেছিলেন ভবানীপুরে। দাদা ছিলেন এই পেশায়। নিজে খেলতেন ফুটবল। থার্ড ডিভিশনে খেলা চিত্তও যেন কখন ভালবেসে ফেললেন এই পেশাকে। ঝাঁপ দিতে হবে চারতলা থেকে, বাইক ওড়াতে হবে ব্রিজে, গায়ে আগুন লাগিয়ে কাচ ভেঙে এগিয়ে যেতে হবে ক্রমশ– জানতেন ঝুঁকি আছে। তবু রোমাঞ্চ উপেক্ষা করে এই সাধ্যি কার? হিরো হতে চেয়েছিলেন? প্রশ্ন করতেই খানিক হেসে ফেললেন। বললেন, “না…না…। তবে অনেককে হিরো করে দিয়েছি। জানেন, আমার গেটআপটা হিরোর মতো। ভিলেনের ক্যারেক্টার করেছি, হিরো জামা খুলিয়ে দিয়েছে। আমি নাকি বেশি হাইলাইটেড হয়ে যাচ্ছি। আসলে উত্তমকুমারের পাড়ার ছেলে তো, ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যোগ তো সেই কবে থেকেই।”

করোনার পর থেকে জীবিকায় টান পড়েছে অনেকটা। ভিএফএক্সের ব্যবহার কেড়ে নিয়েছে তাঁদের ‘কারসাজি’ দেখানোর ক্ষমতা। হালফিলের সিক্সপ্যাকের হিরোরা নিচ্ছেন মার্শাল আর্টের ট্রেনিং, নিজেরাই স্টান্ট করে আপলোড করছেন সামাজিক মাধ্যমে। ওদের ভাঁড়ে মা ভবানী? বলছিলেন, “সমস্যাটি কি জানেন? এখন সবাই সবটা করতে চায়। যেই প্রযোজক, সেই পরিচালক, সেই অভিনেতা। যে হিরো, সেই ডামি, সেই ফাইটমাস্টার। আমরা কোথায় যাই বলুন তো? সাতটা ভার্সনে ছবি করেছি। রজনীকান্ত, বিক্রম কে নেই। কিছু দিন আগেই চিরঞ্জীবীর সঙ্গে ছবি করেছি। নাম ‘ভোলা শঙ্কর’। শ্যাম কৌশলকে চেনেন তো? (ভিকি কৌশলের বাবা, যিনি নিজেও বলিউডের পরিচিত স্টান্টম্যান) তাঁর সঙ্গেও কাজ করেছি। কাহানীতে ছিলাম তো। এই যে কাজলের বইটা আসছে, কলকাতায় যেটার জন্য এলেন, সেখানেও কাজ করেছি আমি।”
এত রিস্ক, এত ঝুঁকি, মৃত্যুভয় কাজ করেনি? আবারও সেই হাসি। তারপর বললেন, “কিছু দিন আগেই নিউমার্কেটের ছাদে একটা ওয়েব সিরিজ করলাম, সেটা করতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট হল কিছু দিন আগে। সারা গায়ে কাটার দাগ আছে। ব্যথা হয়। কিন্তু কী করব? স্পটে একবার পৌঁছে গেলে আর পিছনে ফিরে তাকাতে পারি না।” গলাটা আস্তে হয়ে গেল হঠাৎই। কী সমস্যা জিজ্ঞাসা করতেই ফোনের ওপার থেকে চিত্তবাবু চাপা গলায় বললেন, “ছাদে এলাম কথা বলতে, স্ত্রী ভীষণ টেনশন করে। এসব তো জানে না। আর ছেলেটাও এখন বড় হচ্ছে।” ছেলেও কি বাবার মতো ফাইটমাস্টার…প্রশ্ন শেষ করতে না দিয়েই বললেন, “না না, একদম না। আমি তো চাই না। এই পেশা নয়। যত দিন যাচ্ছে তত অবস্থা খারাপ হচ্ছে। সিঙ্গল স্ক্রিন গুলো উঠে যাচ্ছে দেখছেন না? মাল্টিপ্লেক্সে অত টাকা দিয়ে টিকিট কাটবে, সেই অবস্থাও কি এখানকার মানুষের আছে? এখনও পর্যন্ত টলিউডে ৭৫ জন স্টান্টম্যান আছি। আগামী দিনে সংখ্যাটা কী হবে জানি না। প্রতিবারই ফর্ম বের হয়। ছেলেপিলে এখন কম আসে। আর এলেও দু’তিন জন টিকে যায়। অত সাহসই নেই তাঁদের। আগুন ছুঁতে কি সবাই পারে?”

মৃত্যু ওঁত পেতে আছে প্রতি মুহূর্তে। সুরক্ষার জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে? মৃত্যুর পর বীমা রয়েছে? আর মেডিক্লেম? কবিরাজ বললেন, “দিদি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) আমাদের জন্য একটা মেডিক্লেমের ব্যবস্থা করেছেন। পাঁচ লক্ষ টাকা কভারেজ। তবে বীমা কিছু নেই। পেনশন নেই। আমরা স্টান্টম্যানেরা একটা অফিস করেছি টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োর পাশে। আমি তাঁর সেক্রেটারি। চেষ্টা করছি সত্যি যাদের দরকার, তাঁদের যেন পেনশন দেওয়া যায়। জিৎ, দেব, বুম্বাদা, অঙ্কুশ– টলিপাড়ার হিরোদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল ‘ফাইট’ করেন প্রসেনজিৎই, দরাজ গলায় প্রশংসা করছিলেন চিত্তবাবু। ‘কী ভাল কন্ট্রোল, টাচ লাগবে না, বাকিরাও ভাল। তবে বুম্বাদা মারাত্মক। যদিও অ্যাকশন ছবি আর ক’টাই বা এখন হয় টলিউডে? অঙ্কুশ মির্জা করল। জানেন ৫ কোটি বাজেট। কী পরিশ্রম করেছে ছেলেটা, রিটার্ন কি পেল বলুন? তাহলে নতুন প্রযোজক কেন বাংলায় ইনভেস্ট করবে? সাউথে দেখেছি, ভাল খারাপ যাই হোক, সবাই সিনেমা দেখতে যায় হলে। এখানে কেন যে এমনটা হয়ে গেল?”… বলেই চলছিলেন চিত্ত কবিরাজ। ফ্ল্যাশব্যাক যে ভেসে উঠছিল চোখের সামনে। যোগ করলেন, “এই পেশাটায় টাকা নেই বললে ভুল হবে, তবে খরচটা ঠিক করে করতে হবে। ফিটনেসটা খুব দরকার। এখনও রোজ শরীরচর্চা করি। এমনও স্টান্টম্যান আছে যার ৭২ বছর। আমাদের টলিউডেই আছে। এখনও কি ফিট। নিজেকে ধরে রাখতে পারলে, এই পেশাতে আজও টাকা আছে।”
আর সম্মান? কিং লুথার, বা রাবণের মতো শতাব্দী ধরে উপেক্ষিত নাকি প্রাপ্য মর্যাদা মেলে তাঁদের? অচিরেই দীর্ঘশ্বাস যেন জাপটে ধরল গলাটা। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “মিথ্যেটা লুকোতে পারব না, আর সত্যি ছাড়া বলতে পারব না। যখন ভাল কাজ করি, তখন সবাই হাততালি-টালি দেয়। ওটুকুই আমাদের পাওনা। তারপর যখন বেরিয়ে গেলাম ফ্লোর ছেড়ে তখন কেউ চেনেই না, কেউ মনেই রাখে না। তবে বুম্বাদা এরকম নয়, আমাদের পাশে থাকে, কিন্তু বাকিরা… না কোনও ব্যাপারেই তাঁদের আর আমাদের মনে পড়ে না।” ফোন কাটার আগে বললেন, “মে দিবসের জন্য অফিসের সামনে একটা ছোট অনুষ্ঠান আছে। পারলে আসবেন। সব স্টান্ট ম্যানেরা মিলিত হবেন। আসবেন হ্যাঁ…”

