
অরিজিৎ সিং, নামটাই যথেষ্ঠ বাঙালির আবেগ এবং ভারতীয় সঙ্গীতজগতের সমার্থক হতে। কিন্তু সেই অরিজিৎ যখন প্লেব্যাক বা সিনেমার জগত থেকে চিরতরে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করেন, তখন ভক্তদের মনে প্রশ্নের পাহাড় জমবে এটাই স্বাভাবিক। অরিজিৎ নিজের বয়ানে জানিয়েছেন তিনি স্বাধীনভাবে সঙ্গীত চর্চা করতে চান, কিন্তু বলিউডের অন্দরমহল বলছে অন্য কথা। নেটিজেনদের বড় একটি অংশের দাবি, বছরের পর বছর বলিউডি দলাদলি আর রাজনীতির শিকার হতে হতে কি তবে ক্লান্ত জিয়াগঞ্জের ভূমিপুত্র?
অরিজিতের কেরিয়ারের মধ্যগগনে সবথেকে বড় বিতর্কের নাম ছিল সলমন খান। ২০১৪ সালের একটি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে সলমনকে করা অরিজিতের একটি হালকা ঠাট্টা ‘ভাইজান’ সহজভাবে নিতে পারেননি। তার পরবর্তী ফলাফল ছিল ভয়াবহ। একের পর এক বড় প্রজেক্ট থেকে অরিজিতের গাওয়া গান সরিয়ে দেওয়া হয়। বিশেষ করে ‘সুলতান’ ছবিতে তাঁর গাওয়া ‘জগ ঘুমেয়া’ গানটি বাদ দিয়ে রাহাত ফতেহ আলি খানকে দিয়ে গাওয়ানো হয়। শোনা যায়, এই ঘটনায় চরম হতাশার মুখে পড়েছিলেন অরিজিৎ।
অরিজিৎ প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে দীর্ঘ খোলা চিঠি লিখেছিলেন সলমনের উদ্দেশ্যে, অনুরোধ করেছিলেন তাঁর গানটি যেন রাখা হয়। কিন্তু সলমন গলেননি। যদিও গত বছর ‘টাইগার ৩’ ছবিতে দীর্ঘ ৯ বছর পর সলমন ও অরিজিৎকে একসঙ্গে কাজ করতে দেখা গিয়েছে, তবুও নিন্দুকদের মতে সেই শীতল যুদ্ধের রেশ হয়তো এখনও কাটেনি।
বলিউড মানেই নেপোটিজম এবং ‘লবি’র লড়াই। বহুবার দেখা গিয়েছে, রেকর্ড করা হয়ে গেলেও শেষ মুহূর্তে অন্য কোনও প্রভাবশালী গায়ক বা ‘লবি’র প্রিয় কাউকে দিয়ে গান গাওয়ানো হয়েছে। সঙ্গীত পরিচালকদের সঙ্গে অরিজিতের সম্পর্ক সুমধুর হলেও, প্রযোজকদের খবরদারিতে বহু গান তাঁর হাতছাড়া হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। সুশান্ত সিং রাজপুতের প্রয়াণের পর বলিউডের যে অন্ধকার দিকটি সামনে এসেছিল, অরিজিতের এই হঠাৎ সিদ্ধান্তে সেই কালো ছায়ার ছোঁয়া দেখছেন নেটিজেনরা।
অরিজিৎ বরাবরই লাইমলাইট থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করেন। মুম্বইয়ের গ্ল্যামার দুনিয়া ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গেই বেশি সময় কাটান তিনি। ভক্তদের একাংশের ধারণা, গত এক দশক ধরে সিনেমার গানে যে ধরণের একঘেয়েমি বা ‘রিমিক্স’ সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে অরিজিৎ হয়তো আর তাল মিলিয়ে চলতে চাইছেন না। তিনি নিজের শিল্পকে লবি বা কন্ট্রাক্টের গণ্ডিতে আটকে না রেখে স্বাধীন সুরকার হিসেবে কাজ করতে চান।
তবে কারণ যাই হোক না কেন, বিতর্কের চোরাস্রোত যে প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে অরিজিতের এই বিদায়বেলায় কাজ করছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সলমন খানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব মিটলেও, বলিউডের রাজনীতির গ্রাসে পড়ে আর কতজন প্রতিভাকে হারিয়ে যেতে হবে, অরিজিতের এই ঘোষণায় সেই প্রশ্নই নতুন করে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।