চিরতরে থামল শংকরের কলম, ‘জন অরণ্য’ ছেড়ে ‘কত অজানারে’র দেশে পাড়ি দিলেন ‘চৌরঙ্গী’র পথিক

সেই সময় তিনি ব্যারিস্টার নোয়েল বারওয়েলের ক্লার্ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই বারওয়েল সাহেবই ছিলেন শঙ্করের জীবনের প্রথম 'আইকন'। তাঁর প্রয়াণের পর শঙ্কর কলম ধরেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’ লিখতে। আর সেই প্রথম লেখাতেই বাঙালির ড্রয়িংরুমে জায়গা করে নেন তিনি।

চিরতরে থামল শংকরের কলম, জন অরণ্য ছেড়ে ‘কত অজানারে’র দেশে পাড়ি দিলেন ‘চৌরঙ্গী’র পথিক

|

Feb 20, 2026 | 4:00 PM

তিনি একাই এক শহর। একাই এক চলমান ইতিহাস। যাঁর কলমে অনায়াসে জীবন্ত হয়ে ওঠে ইট-কাঠ-পাথরের ইমারত, মানুষের ভিড়। যাঁর কলমে কংক্রিটের রাস্তায় টুংটাং সুর তোলে প্রাগৈতিহাসিক যুগের ট্রাম্প। যাঁর কলমে বিষন্ন দুপুরে গড়ের মাঠে গল্প বলে ফেরিওয়ালারা। আজ সবাই চুপ। তারা তাদের অভিভাবককে হারিয়েছেন। জনঅরণ্য ছেড়ে চৌরঙ্গীর পথ ধরে তাদের সৃষ্টি কর্তা পাড়ি দিয়েছেন কত অজানার দেশে। তিনি মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় ওরফে শংকর। তাঁর প্রয়াণে অনাথ এই সব চরিত্রেরা। আজ বড্ড দুঃখের দিন বাঙালির।

শঙ্করের সাহিত্যজীবন শুরু হয়েছিল কোনও আকাশকুসুম কল্পনা থেকে নয়, বরং রূঢ় বাস্তবের মাটি থেকে। হাওড়ার এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এই তরুণ একসময় কলকাতার রাজপথে ঘুরেছেন কাজের খোঁজে। সেই সময় তিনি ব্যারিস্টার নোয়েল বারওয়েলের ক্লার্ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই বারওয়েল সাহেবই ছিলেন শঙ্করের জীবনের প্রথম ‘আইকন’। তাঁর প্রয়াণের পর শঙ্কর কলম ধরেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’ লিখতে। আর সেই প্রথম লেখাতেই বাঙালির ড্রয়িংরুমে জায়গা করে নেন তিনি।

বাঙালি পাঠকের কাছে শংকর মানেই এক অদ্ভুত জাদুর পৃথিবী। তাঁর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘চৌরঙ্গী’ কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি একটি যুগসন্ধিক্ষণের দলিল। গ্র্যান্ড হোটেলের আদলে গড়া ‘শাহজাহান হোটেল’ এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাতা বোস, মার্কো পোলো বা করবী গুহর মতো চরিত্রগুলো আজও বাঙালির রক্তে মিশে আছে। এই উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ছবি এবং থিয়েটার আজও সমান জনপ্রিয়।

শঙ্করের বাস্তবধর্মী ও তীক্ষ্ণ লেখনি মুগ্ধ করেছিল সত্যজিৎ রায়ের মতো বিশ্ববিখ্যাত পরিচালককেও। তাঁর অমর দুই সৃষ্টি ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জনঅরণ্য’কে সেলুলয়েডে বন্দি করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। মধ্যবিত্তের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নৈতিক অবক্ষয় এবং কর্পোরেট জগতের লড়াইকে শঙ্কর যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা ভারতীয় সাহিত্যে বিরল। কেবল গল্প-উপন্যাস নয়, শঙ্কর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন বিশিষ্ট গবেষক হিসেবেও। স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর লেখা ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’ বা ‘আমি বিবেকানন্দ বলছি’ গ্রন্থগুলো পাঠককে এক রক্ত-মাংসের স্বামীজির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। বিবেকানন্দের খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে তাঁর মানবিক দিকগুলো শঙ্কর অত্যন্ত নিপুণভাবে সাধারণের সামনে এনেছেন।

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি যেমন লক্ষ লক্ষ পাঠকের ভালোবাসা পেয়েছেন, তেমনই পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মানও। ২০০৩ সালে তিনি পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। এছাড়াও বঙ্গবিভূষণ থেকে শুরু করে অসংখ্য ছোট-বড় সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। একসময় পশ্চিমবঙ্গের শেরিফ পদেও আসীন ছিলেন এই গুণী ব্যক্তিত্ব। আশি বা নব্বইয়ের দশক ছাড়িয়ে আজকের ডিজিটাল যুগেও শঙ্কর একইভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর লেখনীর সহজ গদ্য এবং চরিত্রের গভীরতা বাংলা সাহিত্যের সম্পদ হয়ে থাকবে।

শংকরের জীবনাবসানে শোকপ্রকাশ করেছেন ইমামি গ্রুপের কর্ণধার আদিত্য আগরওয়াল। শোকবার্তায় তিনি জানান, ”সাহিত্যিক মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে আমাদের হৃদয় অত্যন্ত ভারাক্রান্ত। বিশ্বের কাছে তিনি ছিলেন ‘শংকর’—এক প্রবাদপ্রতিম লেখক, যিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। কিন্তু আমাদের কাছে তিনি ছিলেন আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ‘মণিদা’—আমাদের বন্ধু, দার্শনিক এবং পথপ্রদর্শক। তাঁর প্রজ্ঞা আমাদের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সঠিক দিশা দেখিয়েছে; তাঁর দয়া এবং আন্তরিকতা স্পর্শ করেছে তাঁর সান্নিধ্যে আসা প্রতিটি মানুষকে। ইমামি (Emami)-র ৫০তম বর্ষপূর্তিতে তাঁকে সম্মান জানাতে পারা ছিল আমাদের কাছে এক পরম সৌভাগ্য এবং গৌরবের বিষয়। যা ইমামি-র সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের অটুট বন্ধনের এক উদযাপন হিসেবে আমাদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আজ তাঁকে হারানো আমাদের কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাঁর প্রয়াণ কেবল আমাদের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং বাংলা এবং বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের জন্য এক বিশাল ক্ষতি।”