Rabindranath Tagore and Meena Kumari: শুধু শর্মিলা নন, ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল মীনা কুমারীরও! জানেন রবি ঠাকুরের কে ছিলেন ট্র্যাজেডি কুইন?
Meena kumari tragic life story: রবীন্দ্রনাথের ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতনি লতিকা দেবীর নাতনি হলেন শর্মিলা ঠাকুর। কিন্তু জানেন কি শুধু শর্মিলা নন, বলিউডের ট্র্যাজেডি কুইন নামে বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্রের আরেক কিংবদন্তি অভিনেত্রী মীনা কুমারীর সঙ্গেও ঠাকুর পরিবারের যোগ রয়েছে! বিষয়টা বিশদে বলা যাক।

ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের সম্পর্কের কথা সবাই জানেন। শর্মিলা ঠাকুর জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের বংশধর এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দূর সম্পর্কের আত্মীয়া। তিনি সরাসরি রবীন্দ্রনাথের নাতনি নন, তবে রবীন্দ্রনাথের খুড়তুতো ভাই গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশধর। রবীন্দ্রনাথের ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতনি লতিকা দেবীর নাতনি হলেন শর্মিলা ঠাকুর। কিন্তু জানেন কি শুধু শর্মিলা নন, বলিউডের ট্র্যাজেডি কুইন নামে বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্রের আরেক কিংবদন্তি অভিনেত্রী মীনা কুমারীর সঙ্গেও ঠাকুর পরিবারের যোগ রয়েছে! বিষয়টা বিশদে বলা যাক।
রুপোলি পর্দার আলোয় যিনি কোটি কোটি দর্শকের হৃদয় জয় করেছিলেন, সেই অভিনেত্রী মীনা কুমারীর তাঁর আসল নাম ছিল মাহজবীন। রূপ, গুণ আর অভিনয়ের জাদুতে যিনি বলিউড কাঁপিয়েছিলেন, তাঁর ব্যক্তিজীবন ছিল বড়ই কষ্টের । সেই মীনা কুমারীর সঙ্গেই ছিল ঠাকুর পরিবারের গভীর সম্পর্ক।
মীনা কুমারীর পারিবারিক ইতিহাস ঘাঁটলে এক অবাক করা তথ্য সামনে আসে। তাঁর ঠাকুমা হেমসুন্দরী দেবীর প্রথম বিয়ে হয়েছিল যদুনন্দন ঠাকুরের সঙ্গে, যিনি ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুর তুতো ভাই দর্পনারায়ণ ঠাকুরের বংশধর। কিন্তু নিয়তির ফেরে যদুনন্দন ঠাকুরের মৃত্যুর পর জীবন অন্য মোড় নেয়। পরিবারের চাপে হেমসুন্দরী উত্তরপ্রদেশের মেরঠে চলে যান, নার্সের প্রশিক্ষণ নেন এবং পরবর্তীতে পেয়ারে লাল শাকির মীরুটি নামের এক খ্রিস্টান উর্দু সাংবাদিককে বিয়ে করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন।
এই হেমসুন্দরী ও পেয়ারেলালের কন্যা প্রভাবতী দেবী পরবর্তীকালে মঞ্চশিল্পী আলি বক্সকে ভালোবেসে বিয়ে করেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নাম নেন ‘ইকবাল বেগম’। এই দম্পতিরই কোল আলো করে জন্ম নেন মাহজাবীন, যিনি পরবর্তীতে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘মীনা কুমারী’ নামে অমর হয়ে যান।
১৯৩৩ সালে মুম্বইয়ের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া মাহজাবীনের জন্ম মুহূর্তটি কিন্তু আনন্দের ছিল না। কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ায় তাঁর বাবা আলি বক্স এতটাই বিরক্ত হয়েছিলেন যে, তিনি সদ্যোজাত শিশুটিকে এক অনাথ আশ্রমের সামনে ফেলে এসেছিলেন! যদিও পরে মায়ার টানে বা পরিবারের চাপে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়, কিন্তু জন্মের শুরুতেই অবহেলা যেন তাঁর আজীবনসঙ্গী হয়ে গিয়েছিল।
আলি বক্স একসময়ে সংগীতশিল্পী ও থিয়েটার শিল্পী ছিলেন। মুম্বইয়ের দাদারে একটি ছোট চাওল ঘরে পরিবারের দিন কাটত। তাঁর প্রথম স্ত্রী ও তিন সন্তান পাকিস্তানে থাকলেও তিনি ভারতে এসে ইকবাল বেগমকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির তিন মেয়ে— খুরশীদ, মীনা ও মধু।
মীনার বড় বোন খুরশীদ ততদিনে শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু অভাবের তাড়নায় আলি বক্স তাঁর অন্য মেয়েদেরও জোর করে অভিনয়ে নামিয়ে দেন। মীনা যখন প্রথম ক্যামেরার মুখোমুখি হন, তখন বয়স তিন বছর। খেলাধূলোর বয়সে কাঁধে সংসারের বোঝা
খ্যাতনামা লেখক বিনোদ মেহতা তাঁর বিখ্যাত বই ‘মীনা কুমারী- দ্য ক্লাসিক বায়োগ্রাফি’-তে লিখেছেন, ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে মীনা কুমারী একবার বলেছিলেন, “প্রথম যেদিন আমি কাজে বের হই, তখন আমার ধারণাই ছিল না যে আমি শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দকে বিদায় জানাচ্ছি। ভেবেছিলাম কয়েক দিনের জন্য স্টুডিওতে যাব, তারপর স্কুলে ফিরে যাবো। অন্য বাচ্চাদের মতো খেলব, আনন্দ করব। কিন্তু তা আর হয়নি।”
আলি বক্স বিশ্বাস করতেন মেয়েদের স্কুলে পাঠানো মানেই ‘অপ্রয়োজনীয় ব্যয়’। তাই তিনি কড়া শাসনে ছোট থেকেই তাদের কাজে লাগিয়ে দেন। পরিচালক বিজয় ভাটের ‘লেদার ফেস’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ছোট্ট মীনা মাত্র ২৫ টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। এরপর থেকেই পরিবারটির একমাত্র আয়ের উৎস হয়ে ওঠে অবুঝ শিশু মীনা। ৬-৭ বছর বয়স থেকে স্টুডিও থেকে স্টুডিওতে ঘুরে বেড়ানোই হয়ে দাঁড়ায় তাঁর রুটিন।
অভিনয়ের পাশাপাশি ১৯৪১ সালে ‘বেহান’ ছবিতে প্লেব্যাক গায়ক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। বড় বোন বিয়ে করে অভিনয় ছাড়লেও মীনা হয়ে ওঠেন বড় পর্দার নায়িকা। কিন্তু এত টাকা রোজগার করেও নিজের জীবনের একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তাঁর ছিল না।
জীবনের প্রথম নিঃশ্বাস ফেলার মতো একটু স্বস্তি তিনি পেয়েছিলেন যখন পরিচালক কমল আমরোহীকে ভালোবেসে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানতেন, তাঁর বাবা এই বিয়েতে কখনওই রাজি হবেন না। তাই তাঁরা গোপনে বিয়ে করেন। বাবাকে শান্ত করতে দুই লাখ টাকাও দেন মীনা, কিন্তু তাতেও মন গলেনি আলি বক্সের। তিনি মেয়েকে স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন।
কিন্তু মীনা আর পিছু হটেনি। বাবার বাড়িতে আরও এক বছর কাটিয়ে যখন তিনি কমল আমরোহির সঙ্গে একটি ছবিতে কাজের সিদ্ধান্ত নেন এবং বাবার অনৈতিক চাপ মানতে অস্বীকার করেন, সেদিনই তাঁর নিজের টাকায় কেনা বাড়ির দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেন বাবা আলি বক্স। মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে সাফ জানিয়ে দেন, আর যেন কোনও দিন ওই বাড়িতে তিনি না ফেরেন।
বাবার উদ্দেশ্যে লেখা মীনার সেই ভাঙা চিঠির কথা আজও ভক্তদের চোখ আর্দ্র করে দেয়— “বাবুজি, যাই হোক, আমি চলে এসেছি। দয়া করে আদালতে যাওয়ার কথা বলবেন না… আমি আপনার বাড়ি থেকে আমার পোশাক এবং বই ছাড়া আর কিছুই চাই না।”
যিনি নিজের শৈশব বিক্রি করে গোটা পরিবারকে সচ্ছল করেছিলেন, জীবনের শেষ লগ্নে সেই বাবাই তাঁকে ঠেলে দিয়েছিলেন এক নিঃসঙ্গ অন্ধকার জগতে। রুপোলি পর্দার আলোয় উজ্জ্বল মীনা কুমারীর ব্যক্তিগত জীবন চিরকালই রয়ে গেল এক করুণ কাব্যের মতো।
