
বর্তমানে বলিউড তারকাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে বা কোনো নির্দিষ্ট তারকাকে কালিমালিপ্ত করতে ‘পিআর’ (PR) এজেন্সির রমরমা নতুন কিছু নয়। অমিতাভ বচ্চন থেকে দীপিকা পাড়ুকোন— অনেকেই এই ধরনের প্রচারের শিকার হয়েছেন। তবে এই ‘নোংরা খেলা’ যে ১৯৪০-এর দশকেও সমানভাবে সক্রিয় ছিল এবং তার প্রথম বলি হয়েছিলেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী মধুবালা, তা অনেকেরই অজানা।
সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মধুবালার জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায়। রূপ আর অভিনয় দিয়ে বিশ্বকে মুগ্ধ করলেও, পর্দার পেছনের লড়াইটা ছিল অত্যন্ত করুণ। বিশেষ করে ১৯৫০-এর দশকে সংবাদমাধ্যমের একাংশ যেভাবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুৎসিত আক্রমণ শুরু করেছিল, তাতে রীতিমতো প্রাণভয়ে দিন কাটাতেন অভিনেত্রী।
১৯৪৯ সালে ‘মহল’ ছবির বিপুল সাফল্যের পর মধুবালা ছিলেন তৎকালীন বলিউডের সবথেকে নির্ভরযোগ্য তারকা। কিন্তু ১৯৫০ সালে তাঁর নিজের নামে তৈরি ছবি ‘মধুবালা’ ফ্লপ করার পর থেকেই পরিস্থিতি বদলে যায়। যে সংবাদমাধ্যম তাঁর রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল, তারাই রাতারাতি তাঁকে ‘বক্স অফিস পয়জন’ বা বক্স অফিসের বিষ বলে দাগিয়ে দেয়।
বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল ‘নিরালা’ ছবির সেট থেকে। স্বাস্থ্যের বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন মধুবালা অপরিচ্ছন্নতার কারণে স্টুডিওর একটি পুলে নামতে অস্বীকার করেছিলেন। এই খবরটি জানাজানি হতেই শুরু হয় সুপরিকল্পিত আক্রমণ। তাঁর পারিবারিক প্রেক্ষাপট এবং বাবা আতাউল্লাহ খানকে নিয়ে কুরুচিকর গল্প ফাঁদা হতে থাকে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মধুবালা তখন সংবাদমাধ্যমকে নিজের শুটিং সেটে নিষিদ্ধ করেন। ট্যাবলেয়েডগুলির ক্রমাগত চরিত্রহনন মধুবালার স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। আগে থেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত এই অভিনেত্রীর মানসিক চাপ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তিনি নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তৎকালীন বম্বে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী) মোরারজি দেশাই খোদ মধুবালাকে একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিভলভার ইস্যু করেন। আজকের দিনে তারকাদের বাউন্সারের ঘেরাটোপে থাকা স্বাভাবিক মনে হলেও, সেই সময় মধুবালা টানা তিন মাস সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে শুটিং করতে যেতেন।
টানা এক বছর এই অসহযোগিতা চলার পর প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সাংবাদিক বি.কে. করঞ্জিয়ার মধ্যস্থতায় সমস্যা মেটে। মধুবালা ও তাঁর বাবা কয়েকজন বিশিষ্ট সাংবাদিককে নিজেদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান এবং খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটে।
১৯৬৯ সালে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন এই রূপালি পর্দার দেবী। তবে দিলীপ কুমারের সাথে বিচ্ছেদ বা ‘নয়া দৌড়’ ছবি নিয়ে আইনি জটিলতা— মধুবালার শেষ দিন পর্যন্ত বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি। কিন্তু ১৯৫০ সালের সেই পরিকল্পিত ‘চরিত্রহনন’ ভারতীয় বিনোদন জগতের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে রয়ে গিয়েছে।