Devdas in Pakistan: পাকিস্তানে শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’! পাক মাটিতে কীভাবে তৈরি হল বাংলার প্রেমের গল্প?
Pakistani Cinema History: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'দেবদাস' উপন্যাস শতাব্দী পার করেও সমান প্রাসঙ্গিক। তবে এই অমর সৃষ্টি যে কেবল বাংলা বা ভারতের সাহিত্য সংস্কৃতির গণ্ডিতেই আবদ্ধ ছিল না, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ইতিহাসের পাতায়। ভারত ছাড়িয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানেও 'দেবদাস', পার্বতী আর চন্দ্রমুখীর ট্র্যাজিক প্রেমকাহিনি নিয়ে উন্মাদনা ছিল তুঙ্গে।

কখনও অভিশপ্ত প্রেম, কখনও ব্যর্থতার হাহাকার, আবার কখনও বা প্রথাভাঙা সম্পর্কের টানাপোড়েন—১৯১৭ সালে প্রকাশিত সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ উপন্যাস শতাব্দী পার করেও সমান প্রাসঙ্গিক। তবে এই অমর সৃষ্টি যে কেবল বাংলা বা ভারতের সাহিত্য সংস্কৃতির গণ্ডিতেই আবদ্ধ ছিল না, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ইতিহাসের পাতায়। ভারত ছাড়িয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানেও ‘দেবদাস’, পার্বতী আর চন্দ্রমুখীর ট্র্যাজিক প্রেমকাহিনি নিয়ে উন্মাদনা ছিল তুঙ্গে।
ভারতে প্রমথেশ বড়ুয়ার কালজয়ী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুরু করে বিমল রায়ের ক্ল্যাসিক কিংবা পরবর্তীতে সঞ্জয় লীলা বনশালীর জমকালো সেলুলয়েড ক্যানভাস—সবখানেই বারবার রাজত্ব করেছে এই শরৎচন্দ্রের দেবদাস। বাংলা ও হিন্দি ছাড়াও তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম ও অসমিয়া—ভারতের নানা ভাষায় বড় পর্দায় রূপ পেয়ে একাধিকবার বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে এবং পুরস্কৃত হয়েছে ‘দেবদাস’। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় কিংবা দিলীপ কুমার ও শাহরুখ খানের মতো কিংবদন্তি অভিনেতারা এই চরিত্রে অভিনয় করে ভারতীয় সিনেমায় চর্চিত। তবে ভারতের সীমানা পার করে এই একই গল্প নিয়ে ছবি তৈরি হয়েছিল পাকিস্তানের মাটিতেও, যা হয়তো আজ অনেকের কাছেই অজানা।
১৯৬৫ সালে পরিচালক খাজা সরফরাজ উর্দু ভাষায় বড় পর্দায় নিয়ে আসেন ‘দেবদাস’ (Devdas)। ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক কাঁটাতার পেরিয়ে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের আবেগে সেসময় বুঁদ হয়েছিলেন পাক দর্শকেরা। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর তৎকালীন পাকিস্তানি বিনোদন জগতে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেখানে মূল তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সে দেশের খ্যাতনামা তারকা হাবিব (দেবদাস), শামিম আরা (পার্বতী) এবং নায়ার সুলতানা (চন্দ্রমুখী)। এছাড়াও এই ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ সব ভূমিকায় ছিলেন আসাদ বুখারি,আজাদ, আজমল, মায়া দেবী এবং রাজিয়া। এমনকী, পরবর্তীতে পাকিস্তানের কিংবদন্তি অ্যাকশন তারকা হয়ে ওঠা সুলতান রাহি-কেও এই ছবিতে একজন অতিথি শিল্পী হিসেবে দেখা গিয়েছিল।

পাক সেলুলয়েডে ‘দেবদাস’ তৈরি হওয়া নিয়ে জোর আলোচনা চললেও তারকাদের অভিনয় নিয়ে অবশ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। সেই সময়ের বিখ্যাত বিনোদন পত্রিকা ‘The Illustrated Weekly of Pakistan’ তাদের পর্যালোচনায় ছবিটির অভিনয় নিয়ে বেশ কিছু তীক্ষ্ণ মন্তব্য করে। পত্রিকাটি মূল চরিত্রে অভিনয় করা হাবিবের-এর পারফরম্যান্সকে অত্যন্ত হতাশাজনক বলে আখ্যা দেয় এবং দাবি করে যে তিনি দেবদাসের মানসিক যন্ত্রণা ও গভীরতা ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। একইভাবে চন্দ্রমুখী রূপে নায়ার সুলতানাকেও তাঁর চরিত্রে বেশ অস্বস্তিকর লেগেছিল বলে সমালোচনা করা হয়।
তবে সমালোচকদের সমস্ত নেতিবাচক মন্তব্যের মাঝেও এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছিলেন শামিম আরা। পার্বতীর বিচ্ছেদবেদনা ও আত্মত্যাগের নিখাদ রূপ ফুটিয়ে তোলার জন্য তিনি তৎকালীন সিনেমা সমালোচকদের থেকে ভূয়সী প্রশংসা পান। সমালোচনা যা-ই থাক না কেন, পাক চলচ্চিত্রে শরৎচন্দ্রের সৃষ্টিকে নিয়ে তৈরি এই ছবি প্রমাণ করে দেয় যে শিল্পের কোনও নিজস্ব সীমান্ত হয় না। প্রমথেশ বড়ুয়া বা বিমল রায়ের মতো পরিচালকদের কাজ যেমন ভারতের দর্শকদের কাঁদিয়েছে, ঠিক তেমনই ১৯৬৫ সালের খাজা সরফরাজের এই ছবি মনে করিয়ে দেয় সীমান্তের ওপারেও শরৎচন্দ্রের ব্যর্থ প্রেমিক দেবদাসের ট্র্যাজেডি ঠিক ততটাই জীবন্ত ও হৃদয়স্পর্শী ছিল।
