সাত সকালে মমতাকে ফোন রাজের, এরপরেই এল অভিষেকের নম্বর থেকে ফোন, তারপর…
যা কিনা খুব অল্প মানুষই জানেন। কীভাবে একটা ফোনেই তাঁর রাজনীতির আঙিনায় এন্ট্রিকে ত্বরানিত করল, তা এখনও রাজের কাছে রূপকথার মতো। টিভি নাইন বাংলা ডিজিটালের দ্য় ইন্টারভিউ-এর এক পর্বে সেই গল্পই প্রথমবার তুলে ধরলেন রাজ। রাজ স্পষ্টই জানালেন, কীভাবে তাঁর হাতে এল সদা সরগরম ব্য়ারকপুর বিধানসভা কেন্দ্র।

টলিউডের বাণিজ্যিক ছবির সফলতম নামগুলোর তালিকায় তিনি প্রথম সারিতে। যাঁর হাত ধরে বদলে গিয়েছিল বাংলা সিনেমার চেনা সমীকরণ। সেই রাজ চক্রবর্তী এখন কেবল আর ক্যামেরার নেপথ্যের কারিগর নন, তিনি ব্যারাকপুরের তৃণমূল বিধায়ক তথা তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম তারকাপ্রার্থী মুখ। যাঁর হাতে দ্বিতীয়বার ব্যারাকপুরের দায়িত্ব সঁপেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও ২০২১ -এ বিধানসভায় রাজ তারকা প্রার্থী হলেও, এবারটি রাজ নিজেকে তারকা নয়, বরং বিধায়ক হিসেবেই প্রচার করতে চান। কেননা, ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর অবতার যাই হোক না কেন, রাজনীতির মাঠে তাঁর একমাত্র পরিচয় ব্যারাকপুরের বিধায়ক। আর এবারের নির্বাচনে এই ইমেজকেই কাজে লাগাতে চান রাজ।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলার রাজনীতিতে এক বড় চমক ছিল রাজ চক্রবর্তীর তৃণমূলে যোগদান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ঘাসফুল শিবিরে নাম লেখান তিনি। দলে যোগ দেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যারাকপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্রে তাঁকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেয় শীর্ষ নেতৃত্ব। রুপোলি পর্দার জনপ্রিয় মুখ যখন সাধারণ মানুষের দুয়ারে পৌঁছলেন, তখন অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সেই সংশয়কে উড়িয়ে দিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হন তিনি। কিন্তু রাজের এই রাজনীতি তথা তৃণমূলে যোগদান করার নেপথ্যে রয়েছে দারুণ এক গল্প। যা কিনা খুব অল্প মানুষই জানেন। কীভাবে একটা ফোনেই তাঁর রাজনীতির আঙিনায় এন্ট্রিকে ত্বরানিত করল, তা এখনও রাজের কাছে রূপকথার মতো। টিভি নাইন বাংলা ডিজিটালের ‘ইন্টারভিউ’-এর এক পর্বে সেই গল্পই প্রথমবার তুলে ধরলেন রাজ। রাজ স্পষ্টই জানালেন, কীভাবে তাঁর হাতে এল সদা সরগরম ব্যারাকপুর বিধানসভা কেন্দ্র।
২০২১ সালে সরাসরি রাজনীতি বা তৃণমূলে এলেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর কাজের সূচনা বহু আগেই। বলা ভালো ২০১৬ সাল থেকেই মমতার পাশে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। তবে তা একেবারেই তৃণমূলের ক্যাম্পেনিংয়ের কাজের কারণে। ছোটবেলা থেকে বাড়ির লোকেদের কংগ্রেস করতে দেখেছেন রাজ। আর মামা বাড়ির লোকেরা ছিলেন বামপন্থায় বিশ্বাসী। কলেজে টুকটাক রাজনীতি করলেও, সেভাবে কখনই রাজনীতিতে ছিলেন না। তবে প্রথম থেকেই রাজনীতিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মানুষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরাগী ছিলেন তিনি। সেই অনুরাগ থেকেই রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হওয়া রাজের। কিন্তু শেষমেশ যে ভোটের লড়াইয়ে অংশ নেবেন রাজ, তা কখনই ভাবেননি। কিন্তু ২০২১ সালের একটা ঘটনাই একেবারে বদলে দিল রাজের জীবন।
কী ঘটেছিল রাজের সঙ্গে?
সালটা ২০২১। বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে তখন রাজনীতি সরগরম। ভোটের লড়াইয়ে তৃণমূলের কাঁধে নিশ্বাস ফেলতে কোমর বেঁধেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। বিজেপি দলকে ভারী করতে, নির্বাচনে চমক আনতে টলিউডের অন্দর থেকে একের পর এক সেলিব্রিটিকে হাতের মুঠোয় ভরছে গেরুয়া শিবির। এমনকী, তৃণমূলের বাঘা বাঘা নেতারাও ঘাস ফুল ছেড়ে, হাতে তুলছিলেন পদ্ম। ঠিক সেই সময়ই রাজ অনুভব করেন, এবার দিদির পাশে আর ক্যাম্পেনিং নয়, বরং সরাসরি ঝান্ডা ধরার সময় এসেছে। কিন্তু তিনি তো বিনোদন দুনিয়ার মানুষ, রাজনীতির অ আ, ক খ, তাঁর কাছে একেবারেই অজানা। এই ভেবেই সারারাত ঘুমোতে পারেননি তিনি। তবে এটুকু বুঝতে পেরেছিলেন, যে এই সময়ই দিদির পাশে দাঁড়াতে হবে। তাই সাত সকালেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করে বসেন রাজ। স্পষ্ট জানান, তিনি তৃণমূলে যোগ দিতে চান। টিভি নাইন বাংলার ইন্টারভিউ পর্বে রাজ জানান, ”আমার তৃণমূল জয়েন করার কথা শুনতেই, দিদি বলেন, তুই তো আমার সঙ্গেই রয়েছিস! তখন আমি দিদিকে বলি, এভাবে নয়, একেবারে ঝান্ডা হাতে তৃণমূলে আসতে চাই!”
দিদিকে মনের কথা জানানোর পর, কিছুটা যেন স্বস্তি পান রাজ। তার উপর দিদির সম্মতি পাওয়ায় ফূর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ! ঠিক সেই সময়ই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফোন রাজকে…
রাজ জানান, ”আমি যে তৃণমূলে জয়েন করতে যাচ্ছি, তা দিদি ও অভিষেক ছাড়া কেউ জানতেন না। দিদির সঙ্গে কথা হওয়ার পরই অভিষেকের ক্যামাকস্ট্রিট অফিসে যাই। ওখানে উপস্থিত ছিলেন অরূপ বিশ্বাসও। সেখানেই তৃণমূলের জয়নিংয়ের একটা খসড়া তৈরি হয়।”
২০২১ সাল। ডানলপে মমতার সভা। সেখানেই গাড়ি নিয়ে পৌঁছে যান রাজ। সঙ্গে সায়নী ঘোষ, কাঞ্চন মল্লিক এবং জুন মালিয়া। রাজের কথায়, ”কাঞ্চনকে স্পষ্ট বলেছিলাম, বাইরে থেকে দিদি, দিদি করে লাভ নেই। দিদির পাশে থাকতে হবে। তৃণমূলে যোগ দিতে হবে। ”
এরপরেই ঘটে সেই ঘটনা, যা কিনা রাতারাতি পাল্টে দেয় রাজের জীবন। সিনেমার বাইরে রাজনীতির আঙিনায় নতুন ‘চ্যালেঞ্জ’-এর মুখোমুখি এসে দাঁড়ান রাজ। যা কিনা তাঁর জীবনে ‘প্রলয়’-এর থেকে কিছু কম নয়!
আচমকা কী ঘটল?
এবারই এল রাজ রাজনীতির সেকেন্ড সিজন! মমতা স্পষ্ট তাঁকে জানিয়ে দিলেন, তৃণমূলের ঝান্ডা ধরলেই হবে না। ভোটের মাঠে ‘শত্রু’ নাশকে লড়াই করতে হবে। দিদির মুখে এমন কথা শুনে কিছু থতমত খেয়ে যান রাজ। তবে পরে দিদির চ্যালেঞ্জ হাতে নিয়েছিলেন রাজ। স্পষ্টই বলেছিলেন, এমন জায়গায় ভোটে দাঁড় করান, যেখানে লড়াইটা কঠিন। তারপরই রাজ জানতে পারেন, ২০২১ -এ ব্যারাকপুরের তৃণমূল প্রার্থী হচ্ছেন তিনি। বিপরীতে বিজেপির চন্দ্রমণি শুক্লা। প্রথমবার ভোটে দাঁড়িয়েই রেকর্ড ভোটে জিতেছিলেন রাজ। সেই রেকর্ড ভোটকে সঙ্গে নিয়ে রাজ এবারও তৈরি নতুন লড়াইয়ে। আর এবার রাজের বিপরীতে বিজেপির কৌস্তব বাগচী। টিভি নাইন বাংলাকে আত্মবিশ্বাসী রাজ স্পষ্টই জানালেন, ”কৌস্তবকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনেই করি না।” আর সঙ্গে এটাও জানালেন, ২০২১ সালের মতো এবার আর ব্যারাকপুরের তৃণমূলের তারকা প্রার্থী তিনি নন। বরং রেকর্ড ভোটে জয়ী বিধায়ক রাজ চক্রবর্তীই তিনি!
