
তিনি বাঙালির আবেগের শেষ কথা, তিনি ‘মহানায়ক’। কিন্তু যাঁর এক পলক হাসিতে কুপোকাত হতো হাজারো দর্শক, সেই উত্তম কুমারই নিজের ছেলের জন্য সিনেমার দরজা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন। পর্দার বাইরে বাবা হিসেবে ঠিক কেমন ছিলেন উত্তম? কেন তিনি চেয়েছিলেন তাঁর পুত্র গৌতম চট্টোপাধ্যায় অভিনয় জগত থেকে শতহস্ত দূরে থাকুন? সেই অজানা কাহিনি আজও টলিউডের অলিন্দে ঘুরে বেড়ায়।
পড়াশোনা শেষ করে আর পাঁচজন তরুণের মতোই গ্ল্যামার দুনিয়ায় পা রাখার স্বপ্ন দেখেছিলেন গৌতম। ইচ্ছা ছিল বাবার যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে উঠবেন। কিন্তু ছেলের মুখে অভিনয়ের কথা শুনেই মেজাজ হারিয়েছিলেন উত্তম কুমার। সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, “আর যাই হোক, অভিনয় করা যাবে না! সিনেমায় তোমার কোনও ভবিষ্যৎ নেই।” বাবার এই কড়া শাসন সেদিন অবাক করেছিল অনেককেই।
উত্তমপুত্রের কাছে সুযোগ যে আসেনি, তা নয়। পরিচালক হীরেন নাগ তাঁর ছবি ‘অন্ধ অতীত’-এর জন্য গৌতমকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মজার বিষয় হল, সেই ছবিতে স্বয়ং উত্তম কুমারও অভিনয় করছিলেন। অর্থাৎ বাস্তব জীবনের বাবা-ছেলেকে পর্দায় সহ-অভিনেতা হিসেবে দেখার এক দারুণ সুযোগ তৈরি হয়েছিল। পরিচালক এবং গৌতম দুজনেই মুখিয়ে থাকলেও বাধ সাধেন মহানায়ক। তিনি চাননি তাঁর পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম স্টুডিওর আলো-আঁধারিতে হারিয়ে যাক।
নিজের ছেলেকে ইন্ডাস্ট্রিতে আসতে বাধা দেওয়ার পিছনে ছিল মহানায়কের জীবনের এক তিক্ত অভিজ্ঞতা। উত্তম কুমারের নিজের কেরিয়ারের শুরুটা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। দিনের পর দিন এনটিওয়ান বা ইন্দ্রপুরী স্টুডিওর দরজায় পড়ে থাকা, একের পর এক ছবির ব্যর্থতা এবং ‘ফ্লপ মাস্টার’ তকমা— সবটাই খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি। এক সময় তো তিনি অভিনয় ছেড়ে পোর্ট ট্রাস্টের চাকরিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন।
মহানায়ক বুঝেছিলেন, গৌতম অভিনয় শুরু করলেই লোকে প্রতি পদে তাঁর সঙ্গে বাবার তুলনা করবে। সেই আকাশছোঁয়া প্রত্যাশার চাপ গৌতম সহ্য করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন তিনি। ভাই তরুণ কুমারের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত নিজেই উদ্যোগী হয়েছিলেন উত্তম। ছেলেকে অভিনয়ের অনিশ্চিত জগত থেকে সরিয়ে তিনি একটি ওষুধের ব্যবসার ব্যবস্থা করে দেন। অভিনেতার বদলে ছেলেকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে দেখতেই স্বস্তি পেয়েছিলেন তিনি। আজকের দিনে যখন ‘নেপোটিজম’ বা স্বজনপোষণ নিয়ে এত আলোচনা হয়, তখন মহানায়কের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল একজন সুপারস্টার ছিলেন না, বরং একজন দূরদর্শী ও সুরক্ষক বাবাও ছিলেন।