
মুম্বই: তিনি শরদ পওয়ারের ভাইপো। রাজনীতিতে প্রবেশের পর এটাই তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠে। জাতীয় জোট রাজনীতিতে মুখ্য ভূমিকা পালনের জন্য শরদকে অনেকেই চাণক্যের সঙ্গে তুলনা করেন। জোট রাজনীতিতে কাকু শরদের চেয়ে বোধহয় কোনও অংশ কম ছিলেন না ভাইপো অজিত পওয়ার। মহারাষ্ট্রে একাধিক সরকার বদলেছে। মুখ্যমন্ত্রী মুখ বদল হয়েছে। জোট বদল হয়েছে। কিন্তু, দীর্ঘদিন তিনি উপমুখ্যমন্ত্রী থেকে গিয়েছেন। তিনি সুযোগসন্ধানী কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। কাকু শরদের সঙ্গে মনোমালিন্য হয়েছে। এনসিপি ভেঙে গিয়েছে। বুধবার সকালে বিমান দুর্ঘটনায় অজিত পওয়ারের মৃত্যুর পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফিরে দেখা যাক অজিত পওয়ারের রাজনৈতিক পথচলা।
অজিত পওয়ারের জন্ম ১৯৫৯ সালের ২২ জুলাই। শরদ পওয়ারের দাদা অনন্তরাও পওয়ারের পুত্র অজিত। কলেজে পড়ার সময়ই পড়াশোনা ছাড়তে হয় তাঁকে। কারণ, বাবার মৃত্যু। পরিবারের দেখভালের পড়াশোনা ছেড়ে দেন তিনি। কাকা শরদের হাত ধরেই কংগ্রেসের রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি ১৯৮২ সালে। ১৯৯১ সালে পুনে জেলা সেন্ট্রাল কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। যে পদে তিনি ১৬ বছর ছিলেন।
১৯৯১ সালে প্রথমবার সাংসদ নির্বাচিত হন অজিত। বারামতী লোকসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হন। কিন্তু, আসনটি তিনি ছেড়ে দেন, যাতে শরদ পওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। ওই আসন থেকে জিতেই পিভি নরসিমহা রাওয়ের সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন শরদ।
রাজনীতির কারবারিরা বলেন, কাকার জন্য আসন ছেড়ে দেওয়াতেই হয়তো অজিতের উপর আস্থা আরও বেড়ে যায় শরদের। লোকসভা আসন ছাড়ার পর ১৯৯১ সালে বারামতী বিধানসভা আসনে উপনির্বাচনে জয়ী হন অজিত। বারামতীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে আরও মজবুত হয়েছে। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এই বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক থেকে গেলেন। ১৯৯১ সালে বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী সুধাকররাও নায়েকের মন্ত্রিসভার কৃষি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী হন তিনি। ১৯৯২ সালে শরদ পওয়ার মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী হলে একাধিক দফতরের প্রতিমন্ত্রী হন।
১৯৯৯ সালে ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) তৈরি করেন শরদ। কংগ্রেস ছাড়েন অজিত। ধীরে ধীরে কাকার দলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আসেন। কিন্তু, যে কাকার হাত ধরে রাজনীতিতে উত্থান, সেই শরদের সঙ্গেই একসময় দ্বন্দ্ব বাধে অজিতের। ২০১৯ সালের ২৩ নভেম্বর শরদ পওয়ারের অসম্মতিতেই মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকারের সঙ্গে হাত মেলান অজিত। উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকারকে সমর্থন জানিয়ে এনসিপি বিধায়কদের সই করা চিঠি জমা দেন তিনি।
তবে ৮০ ঘণ্টার মধ্যে সেই সরকার পড়ে যায়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীস এবং অজিত পদত্যাগ করেন। অজিত ফের এনসিপিতে ফিরে আসেন। আবার ২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বর ঘোষণা করা হয়, মহারাষ্ট্রে মহাবিকাশ আঘাড়ি সরকার গঠন করছে। এবং অজিত পওয়ার উপমুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী হন উদ্ধব ঠাকরে।
২০২২ সালে শিবসেনার মধ্যে ভাঙন ধরে। ফলে মহাবিকাশ আঘাড়ি সরকার পড়ে যায়। একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে শিবসেনার একটি অংশ এবং বিজেপি সরকার গঠন করে। শিন্ডে মুখ্যমন্ত্রী হন। সেইসময় বিরোধী দলনেতা হন অজিত। বছর খানেক বিরোধী দলনেতা ছিলেন। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ফের মহারাষ্ট্রে সরকারে যোগ দেন অজিত। তখনও একনাথ শিন্ডে মুখ্যমন্ত্রী। অজিত ও দেবেন্দ্র উপমুখ্যমন্ত্রী হন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিজেপির সঙ্গে শিবসেনা ও তাঁর দলের জোট ফের সরকার গঠন করে। এই সরকারেও উপমুখ্যমন্ত্রী হন অজিত। অবশ্য অজিত প্রথমবার উপমুখ্যমন্ত্রী হন ২০১০ সালের নভেম্বরে। তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেসের পৃথ্বীরাজ চহ্বান। ২০১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই পদে ছিলেন তিনি। এরপর ফের ওই বছরের ডিসেম্বরে উপমুখ্যমন্ত্রী হন। পদে ছিলেন ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এবারও মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন পৃথ্বীরাজ।
বছর দুয়েক আগে এনসিপি-র নাম ও প্রতীক নিয়ে শরদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বেধেছিল অজিত। এনসিপি-র বিধায়কদের একটা বড় অংশকে সঙ্গে নিয়ে নিজেকে দলের সভাপতি হিসেবে দাবি করেন অজিত। দলের নাম ও প্রতীক তাঁরাই ব্যবহার করতে পারবেন বলে দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হন। ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারির অজিতের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকেই এনসিপি-র নাম ও প্রতীক ব্যবহারের অধিকার দেয়। আর শরদের নেতৃত্বাধীন এনসিপি হয়ে যায় এনসিপি(শরদচন্দ্র পওয়ার)।
মহারাষ্ট্রের অর্থ, সেচ, গ্রামীণ উন্নয়নের মতো দফতর সামলেছেন তিনি। দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। সেচ প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর নাম জড়ায়। তবে পুনের বারামতীতে তাঁর প্রভাবে চিড় ধরেনি। আর সেই বারামতীতে জেলা পরিষদের নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন বছর ছেষট্টির অজিত। পিছনে পড়ে রইল বিতর্ক, আর জোট রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা।