India water crisis: আপনার শহরে আর কতটা জল অবশিষ্ট রয়েছে?
Groundwater Depletion in Indian Cities: নীতি আয়োগের কম্পোজিট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনডেক্স এবং কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের ভূগর্ভস্থ জল সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে করা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভারতের অন্তত ২১টি বড় শহরে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর বিপজ্জনকভাবে নেমে গিয়েছে। এটি কোনও সুদূর ভবিষ্যতের বিপর্যয়ের সতর্কবার্তা নয়। এই মুহূর্তে ভারতের একাধিক শহরের বাস্তব পরিস্থিতিরই বর্ণনা। লিখছেন সন্তোষ নায়ার।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে গ্রীষ্মে বেঙ্গালুরুর বাসিন্দাদের এক ট্যাঙ্কার জল কিনতে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে। অথচ একসময় এই শহরে ২৬০টিরও বেশি হ্রদ ছিল। আজ সেই সংখ্যার অর্ধেকেরও কম, ৮০-৮১টি হ্রদে এখন জল রয়েছে। শহরজুড়ে হাজার হাজার নলকূপ পুরোপুরি শুকিয়ে গিয়েছে।
সমুদ্রবেষ্টিত দ্বীপাঞ্চলের উপর গড়ে ওঠা মুম্বই শহরেও বছরের পর বছর জলসংকট দেখা দিয়েছে। শহরের পানীয় জলের প্রায় পুরোটাই আসে যে জলাধারগুলি থেকে, সেগুলির জলস্তর একসময় মোট ধারণক্ষমতার মাত্র ৯ থেকে ১০ শতাংশে নেমে এসেছিল। বৃষ্টি আরও দেরি হলে এই জল দিয়ে বড়জোর এক মাস চলতে পারত। দিল্লি ও তার বিস্তীর্ণ পার্শ্ববর্তী অঞ্চল আংশিকভাবে ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরশীল। অথচ সরকারি শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, ওই অঞ্চলের ২১টি পৃথক এলাকায় ভূগর্ভস্থ জলের পরিস্থিতি এখন সংকটজনক। প্রায় ৩.৩ কোটি মানুষের বসবাস এই অঞ্চলে। সরকারি মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভারতের বড় শহরগুলির মধ্যে হায়দরাবাদে ভূগর্ভস্থ জলের পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। শহরটির ২৬টি প্রশাসনিক বিভাগে জল উত্তোলনের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে অথবা সেগুলি সংকটজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
নীতি আয়োগের কম্পোজিট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনডেক্স এবং কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের ভূগর্ভস্থ জল সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে করা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভারতের অন্তত ২১টি বড় শহরে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর বিপজ্জনকভাবে নেমে গিয়েছে। এটি কোনও সুদূর ভবিষ্যতের বিপর্যয়ের সতর্কবার্তা নয়। এই মুহূর্তে ভারতের একাধিক শহরের বাস্তব পরিস্থিতিরই বর্ণনা।
ভারতে কেন জল সংকট দেখা দিচ্ছে?
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক হল, মরুভূমির কোনও দেশের মতো ভারত সামগ্রিকভাবে জলের অভাবে ভুগছে না। অধিকাংশ বছরেই দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বর্ষার বৃষ্টি হয়। সংকটের মূল কারণ আকাশ থেকে কতটা বৃষ্টি পড়ছে, তা নয়। বরং বৃষ্টির জল মাটিতে পড়ার পর কী হচ্ছে, এবং যে ব্যবস্থাগুলি একসময় সেই জল ধরে রাখত, মাটির ভিতরে শোষণ করত ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তুলত, শহরগুলি সেগুলির সঙ্গে কতটা অবহেলার আচরণ করেছে, সেটাই আসল প্রশ্ন।
বেঙ্গালুরুর হ্রদগুলির পরিণতির কথাই ধরা যাক। খরার কারণে সেগুলি হারিয়ে যায়নি। শহরের জনসংখ্যা ও আবাসন ব্যবসার দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে একের পর এক হ্রদ ভরাট করে সেখানে তৈরি হয়েছে আবাসন, প্রযুক্তি পার্ক ও রাস্তা। মাটির নীচে কতটা জল রয়েছে, তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার আগেই শহর বেড়ে উঠেছে অনেক দ্রুত।
একটি হ্রদের কাজ শুধু চোখের সামনে জল ধরে রাখা নয়। সেটি আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডারকে পুনরায় পূর্ণ হতেও সাহায্য করে। বেঙ্গালুরুর ১৮০টি হ্রদ হারিয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু উপরিভাগের জল কমে যাওয়া নয়। এর ফলে শহরের কয়েক প্রজন্ম ধরে নির্ভর করে থাকা ভূগর্ভস্থ জল পুনর্ভরণের ব্যবস্থাটিও নীরবে ভেঙে পড়েছে। অনেক বাসিন্দা এই যোগসূত্র বুঝতে পারেননি, যতক্ষণ না তাঁদের নিজেদের বোরওয়েল থেকে জল ওঠা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
ভূগর্ভস্থ জল অলক্ষ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে-
জলাধারের মতো ভূগর্ভস্থ জল চোখের সামনে দেখা যায় না। যতক্ষণ না তা ফুরিয়ে যাচ্ছে, ততক্ষণ তার সংকটও সহজে বোঝা যায় না। একটি পরিবার বছরের পর বছর বোরওয়েল থেকে জল তুলতে পারে, অথচ কোনও সমস্যা চোখে পড়ে না। তারপর একদিন পাম্প চালু করলেও জল ওঠে না, বেরিয়ে আসে শুধু বাতাস। তত দিনে ওই এলাকার ভূগর্ভস্থ জলস্তর বা অ্যাকুইফার কয়েক দশকের অতিরিক্ত জল উত্তোলনের ফলে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার মুখে পৌঁছে যেতে পারে। সেই জলভাণ্ডার পুনরায় পূর্ণ হতে আরও কয়েক দশক লাগতে পারে। আদৌ তা আগের অবস্থায় ফিরবে কি না, সেটাও অনিশ্চিত।
এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাওয়া একটি পরিবারের কথা ভাবুন। বেঙ্গালুরুর একটি আবাসনে বসবাসকারী এক মাকে এখন বিদ্যুতের বিলের মতোই জলের খরচের হিসাব রাখতে হয়। কখন জলের ট্যাঙ্কার আসবে, তার খোঁজ নিতে হয়। আবাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভাগ করে জলের খরচ মেটানোর বিষয়ে আলোচনা করতে হয়। শুষ্ক সপ্তাহগুলিতে স্নানের জলও মেপে খরচ করতে হয়। এক প্রজন্ম আগেও শহুরে ভারতীয় জীবনে এগুলি স্বাভাবিক বিষয় ছিল না। অথচ মাত্র এক দশকের মধ্যে, কিছু এলাকার দৈনন্দিন জীবনে এই পরিস্থিতিই নীরবে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
জলের অভাব স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ-
এই সংকটের স্বাস্থ্যগত পরিণতি দৈনন্দিন অসুবিধার চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর। ভারতে প্রতি বছর আনুমানিক দুই লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় দূষিত জলের সঙ্গে সম্পর্কিত অসুস্থতায়। টাইফয়েড, জন্ডিস এবং বিভিন্ন জলবাহিত সংক্রমণের মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যখন বিশুদ্ধ জলের অভাব দেখা দেয় এবং মানুষ কম নির্ভরযোগ্য জলের উৎস ব্যবহার করতে বাধ্য হন।
ভারতীয় শহরগুলো কি আবার জলসমৃদ্ধ হতে পারবে?
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারতের শহরগুলির ভবিষ্যৎ স্থায়ীভাবে জলশূন্য হয়ে পড়া। আজ যে শহরগুলি জলসংকটের মুখে, সেগুলির কয়েকটিই আবার প্রমাণ করেছে যে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। বেঙ্গালুরুতে হ্রদ পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া জলাশয়গুলির মধ্যে কিছু পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। একাধিক রাজ্যে নতুন বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে আইনত বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাস্তবে নিয়ম কার্যকর করা এবং সেই ব্যবস্থার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হলে তা কাজে আসে। শুধু ব্যবস্থা তৈরি করে ফেলে রাখলে কোনও লাভ হয় না।
২০১৯ সালে চেন্নাইও ‘ডে জিরো’ বা শহরের জল সরবরাহ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার মুখোমুখি হয়েছিল। পরে নতুন জলাধার নির্মাণ, সমুদ্রের জল পরিশোধন করে পানীয় জল তৈরি এবং ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহারের উপর কঠোর বিধিনিষেধের মতো একাধিক পদক্ষেপের মাধ্যমে শহরটি কিছুটা জলসংকট মোকাবিলার সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। তবে সেখানেও জলের চাপ পুরোপুরি দূর হয়নি।
এই সমাধানগুলির অধিকাংশের মধ্যেই একটি সাধারণ বিষয় রয়েছে। সংকট চোখে পড়ার বহু বছর আগেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোথায় নির্মাণকাজ হবে, একটি বোরওয়েল থেকে আইনত কতটা জল তোলা যাবে, কিংবা কোনও হ্রদকে সংরক্ষণ করা হবে, নাকি সেই জায়গা বুজিয়ে নির্মাণ করা হবে—সময় থাকতে এই সিদ্ধান্তগুলিই ভবিষ্যতের জলসংকটের গতিপথ নির্ধারণ করে।
আপনার শহরের জলের স্তর বাড়ছে নাকি কমছে?
সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাই সৎ প্রশ্নটি এই নয় যে আপনার শহরে আগামিকালই জল ফুরিয়ে যাবে কি না। অধিকাংশ শহরে এমনটা হবে না, অন্তত একসঙ্গে সব জল শেষ হয়ে যাবে না। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, গত এক দশকে আপনার শহরের ভূগর্ভস্থ জলের স্তর বেড়েছে, নাকি কমেছে? আর এই প্রশ্নের উত্তর যাই হোক না কেন, তার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাউকে কি জবাবদিহি করতে হচ্ছে?
সূত্র: নীতি আয়োগের কম্পোজিট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনডেক্স; কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের ডায়নামিক গ্রাউন্ডওয়াটার রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট এবং ভূগর্ভস্থ জলের শ্রেণিবিন্যাস সংক্রান্ত তথ্য; বেঙ্গালুরু, মুম্বই, দিল্লি-এনসিআর ও হায়দরাবাদের শহুরে জলসংকট নিয়ে সরকারি ভূগর্ভস্থ জল ও জলাধারের তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন।
