Public health in India: ভারত কি আগের চেয়ে বেশি সুস্থ, নাকি অসুস্থতার ধরনটাই শুধু বদলে গিয়েছে?
India’s Changing Health Risks: অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে স্থূলতা, ডায়াবিটিস এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি। আজকের ‘YOUR INDIA’ কলামে সন্তোষ নায়ার তুলে ধরেছেন, কীভাবে বদলাচ্ছে দেশের স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার চিত্র এবং কেন এখন অপুষ্টি ও জীবনযাত্রাজনিত স্বাস্থ্যসমস্যা—দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এক ঠাকুমার মনে আজও স্পষ্ট তাঁর ছোটবেলার স্মৃতি। তখন খাবারের অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকত একটানা দুশ্চিন্তা। তাঁর নাতি একই শহরে বড় হচ্ছে। কিন্তু খাবারের অভাবের সেই ভয় তাকে কখনও তাড়া করেনি। বরং অল্প বয়সেই তার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ে চিন্তিত থাকতে হচ্ছে চিকিৎসককে। যে বয়সে এমন সমস্যা হতে পারে, তা ভাবতেই অবাক হয়ে যান তার ঠাকুমা।
একই দেশের স্বাস্থ্যচিত্রের এই দুই দিকই এখন পাশাপাশি রয়েছে। কখনও একই সময়ে, এমনকী একই পরিবারের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে এই দুই ধরনের সমস্যা।
ভারতের সাম্প্রতিক ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে বা জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষায় দীর্ঘদিনের একটি সমস্যার ক্ষেত্রে প্রকৃত অগ্রগতির ছবি উঠে এসেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে স্টান্টিং বা দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির কারণে বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম হওয়ার হার ২০১৯–২১ সালে ছিল ৩৫.৫ শতাংশ। ২০২৩–২৪ সালের মধ্যে তা কমে হয়েছে ২৯.৩ শতাংশ। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় ৬ শতাংশ পয়েন্টের এই হ্রাস যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
এর পিছনে রয়েছে মাতৃপুষ্টির উন্নতি, সরকারি খাদ্য সরবরাহ ও পুষ্টি কর্মসূচির প্রসার এবং উন্নত স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সুবিধা আরও বেশি পরিবারের কাছে পৌঁছে যাওয়া।
কিন্তু প্রায় একই সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সূচক দ্রুত উল্টো দিকে এগিয়েছে। ২০০৫–০৬ সালে ভারতের যে মহিলাদের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল বা যাঁরা স্থূলতার শিকার ছিলেন, তাঁদের হার ছিল ১২.৬ শতাংশ। ২০২৩–২৪ সালের মধ্যে তা বেড়ে হয়েছে ৩০.৭ শতাংশ। অর্থাৎ, দুই দশকেরও কম সময়ে এই হার দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
একই সাম্প্রতিক সময়পর্বে মহিলাদের রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকার হার ১৩.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭.৮ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ১৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ২১ শতাংশে পৌঁছেছে।
অপুষ্টির দ্বৈত বোঝা কী?
এই পরিসংখ্যানগুলি একসঙ্গে দেখলে এমন একটি পরিস্থিতির ছবি ফুটে ওঠে, যাকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন ‘ডাবল বার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন’ বা অপুষ্টির দ্বৈত বোঝা। অর্থাৎ, একই জনসংখ্যার মধ্যে পুষ্টির ঘাটতি এবং অতিরিক্ত পুষ্টিজনিত সমস্যা—দুই-ই দেখা যাচ্ছে। কখনও একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে, আবার কখনও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে একই ব্যক্তির মধ্যেও এই দুই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এটি শুধু উন্নতি বা অবনতির গল্প নয়। বরং ভারতের স্বাস্থ্যসংকটের ধরন কীভাবে বদলে যাচ্ছে, তারই ছবি। পরিবর্তন এত দ্রুত ঘটছে যে অধিকাংশ পরিবার, এমনকী স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় অংশও, এখনও এই নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে উঠতে পারেনি।
দেখা যাক, এই দুই সমস্যার পিছনে কী কী কারণ কাজ করছে-
অপুষ্টি সাধারণত কমতে থাকে অর্থনৈতিক উন্নতি, খাবারের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি এবং মা ও শিশুদের জন্য পরিকল্পিত শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির হাত ধরে।
অন্যদিকে, স্থূলতা ও ডায়াবিটিস বৃদ্ধির পিছনেও অনেক সময় কাজ করে সেই একই অর্থনৈতিক উন্নয়ন। তবে এক্ষেত্রে প্রভাবগুলি আলাদা। দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, প্রক্রিয়াজাত ও অতিরিক্ত ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবারের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার প্রবণতা—সবই এর সঙ্গে যুক্ত। অফিসে, স্ক্রিনের সামনে কিংবা গাড়িতে দীর্ঘ সময় কাটানোর ফলে হাঁটাচলা ও শারীরিক সক্রিয়তার সুযোগও কমে যাচ্ছে।
অর্থাৎ, যে পরিবর্তনগুলি ভারতকে একটি স্বাস্থ্যসংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করছে, সেগুলিরই কিছু দিক নিঃশব্দে আরেকটি স্বাস্থ্যসংকটের জন্ম দিচ্ছে।
একই সঙ্গে অপুষ্টি ও জীবনযাত্রাজনিত রোগের মোকাবিলা কি সম্ভব?
এর একটি বাস্তব প্রভাব রয়েছে। আগামী দিনে ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সাধারণ পরিবারগুলিকে স্বাস্থ্য নিয়ে কীভাবে ভাবতে হবে, তার উপরেও এর প্রভাব পড়বে।
যে জনস্বাস্থ্য কৌশলের মূল লক্ষ্য অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াই, তার ধরন ডায়াবিটিস ও হৃদরোগ প্রতিরোধের কৌশলের থেকে অনেকটাই আলাদা। কিন্তু ভারতের এখন ক্রমশ এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে একই সময়ে এই দুই সমস্যার মোকাবিলা করা যাবে। একই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দুই ধরনের পরিষেবা দিতে হবে, কখনও একই পরিবারের একাধিক সদস্যের জন্যও। এটি যে কোনও একটি সমস্যার সমাধানের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন কাজ।
সাধারণ পাঠকের কাছে এই পরিস্থিতির শিক্ষা হল, দিদিমা-ঠাকুমার প্রজন্মের খাদ্যাভাবের গল্প শুনে নাতি-নাতনিদের স্বাস্থ্য যে আগের চেয়ে ভালো, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। একইভাবে, নতুন প্রজন্মের ডায়াবিটিস বা স্থূলতার সমস্যা দেখে এটাও বলা যায় না যে সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে।
দুই ধরনের ঝুঁকিই বাস্তব। তবে সেগুলির মোকাবিলার পদ্ধতি আলাদা। প্রয়োজন সচেতনতা, যথাযথ নজরদারি এবং যেখানে সম্ভব, আগাম প্রতিরোধের ব্যবস্থা। এক প্রজন্মের সমস্যা দূর হয়েছে মানেই তার জায়গায় আর কোনও সমস্যা তৈরি হয়নি—এমনটা ধরে নেওয়া ভুল।
ভারতের স্বাস্থ্য কি সত্যিই ভালো হচ্ছে, নাকি বদলে যাচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকির ধরন?
পরিবারের বয়স্ক ও তরুণ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের তুলনা করার সময় তাই খুব সহজ কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া উচিত নয়। বরং প্রশ্ন করা প্রয়োজন, কোন প্রজন্মের কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে এবং সেই ঝুঁকিগুলির দিকে যথেষ্ট নজর দেওয়া হচ্ছে কি না।
সূত্র: ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (NFHS-5, ২০১৯–২১ এবং NFHS-6, ২০২৩–২৪-এর তুলনামূলক তথ্য); এসবিআই রিসার্চের NFHS-6 সমীক্ষার বিশ্লেষণ; NFHS-এর তথ্যের ভিত্তিতে অপুষ্টি ও অসংক্রামক রোগের প্রবণতা নিয়ে ইউনিসেফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন।
