Euthanasia in India: অরুণা পাননি, হরীশ পাচ্ছেন ‘সম্মানের মৃত্যু’র অধিকার, ভারতে স্বেচ্ছামৃত্যুর আইন ঠিক কেমন?

অ্যাক্টিভ ইউথানাসিয়ার ক্ষেত্রে কোনও অসুস্থ ব্যক্তির আবেদনে চিকিৎসক তাঁর মৃত্যুর ব্যবস্থা করে দেন। লাইফ সাপোর্ট খুলে নিয়ে বা কোনও ইঞ্জেকশন দিয়ে সেই মৃত্যুর ব্যবস্থা করা হয়। ভারতে এই প্রক্রিয়া খুনের সমান অপরাধ বলে গণ্য হয়। আর প্যাসিভ ইউথানাসিয়া হল, যেখানে কোনও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা জড় পদার্থের মতো হলে অর্থাৎ ভেজিটেটিভ স্টেটে থাকলে তাঁর পরিবার বা কাছের মানুষদের আবেদনে চিকিৎসক মৃত্যুর ব্যবস্থা করতে পারে।

Euthanasia in India: অরুণা পাননি, হরীশ পাচ্ছেন সম্মানের মৃত্যুর অধিকার, ভারতে স্বেচ্ছামৃত্যুর আইন ঠিক কেমন?

Mar 12, 2026 | 6:23 PM

নয়া দিল্লি: ‘লজিক’ বা ‘রিজন’ নয়, ভালোবাসা, কষ্ট আর করুণার উপর ভিত্তি করেই দেওয়া হল রায়। বুধবার ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করতে গিয়ে এমনটাই বলেছে দেশের সুপ্রিম কোর্ট। দেশের ইতিহাসে প্রথমবার নিষ্কৃতি-মৃত্যু বা ইউথানাসিয়ায় মান্যতা দিল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত মনে করিয়ে দিল মৃত্য়ুর চেয়েও কঠিন ‘মৃত্যুযন্ত্রণা’। ৪২ বছর ধরে যন্ত্রণার যে জীবন কাটাতে হয়েছে অরুণা শানবাগকে আজ হরিশ রানা সেই একই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন কীভাবে? কী বলছে আইন?

স্বেচ্ছামৃত্যুর বা ইউথানাসিয়া ভারতে এক বহুল আলোচিত বিষয়। স্পেন, কানাডা, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডের মতো কয়েকটি দেশে ইউথানাসিয়া আইনসিদ্ধ। তবে এই ইউথানাসিয়া দু’ধরনের। অ্যাক্টিভ আর প্যাসিভ।

অ্যাক্টিভ ইউথানাসিয়ার ক্ষেত্রে কোনও অসুস্থ ব্যক্তির আবেদনে চিকিৎসক তাঁর মৃত্যুর ব্যবস্থা করে দেন। লাইফ সাপোর্ট খুলে নিয়ে বা কোনও ইঞ্জেকশন দিয়ে সেই মৃত্যুর ব্যবস্থা করা হয়। ভারতে এই প্রক্রিয়া খুনের সমান অপরাধ বলে গণ্য হয়। আর প্যাসিভ ইউথানাসিয়া হল, যেখানে কোনও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা জড় পদার্থের মতো হলে অর্থাৎ ভেজিটেটিভ স্টেটে থাকলে তাঁর পরিবার বা কাছের মানুষদের আবেদনে চিকিৎসক মৃত্যুর ব্যবস্থা করতে পারে। একসময় ভারতে এই প্রক্রিয়ারও কোনও জায়গা ছিল না। ৪২ বছর ধরে জড় পদার্থের মতো শুয়ে থাকা সত্ত্বেও নিউমোনিয়া হওয়ার আগে নিষ্কৃতি পাননি তিনি। কিন্তু আইনি লড়াই চলে দীর্ঘ সময়। ২০১৮ সালে প্যাসিভ ইউথানাসিয়ায় সম্মতি দেয় সুপ্রিম কোর্ট। তৈরি হয় গাইডলাইন।

৮ বছর পর সেই প্যাসিভ ইউথানাসিয়ায় সম্মতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। ১৩ বছর ধরে বিছানায় পাথরের মতো পড়ে থাকা হরীশ রানার লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হবে আস্তে আস্তে। তবে এ ক্ষেত্রে হরীশের বাবা-মায়ের লড়াইটা খুব সহজ ছিল না। বিচারপতি জে বি পর্দিওয়ালা ও বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথন বুধবার এই রায় ঘোষণা করে।

শুরুটা করেছিলেন পিঙ্কি ভিরানি। ২৫ বছর বয়সে ভয়ঙ্কর যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল পেশায় নার্স অরুণা শানবাগকে। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর যখন তাঁকে পাওয়া যায়, দেখা যায় তাঁর গলায় বাঁধা কুকুর বাঁধার চেন, চারপাশ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কোনও ক্রমে চোখ মেলে তাকাচ্ছেন তিনি। দ্রুত তাঁকে হাসপাতালের বেডে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকরা খুব দ্রুত বুঝে যান, অরুণার ফেরার আর কোনও আশা নেই। চোখে দেখতে পেতেন অরুণা, কিন্তু চোখ দিয়ে দেখার মতো কাজ তাঁর মস্তিষ্ক করতে পারত না। ৩৭ বছর এভাবে পড়ে থাকার পর তাঁর মৃত্যুর অধিকার নিয়ে আইনের দ্বারস্থ হন সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট পিংকি ভিরানি।

সুপ্রিম কোর্ট সেই সময় প্যাসিভ ইউথানাসিয়াকে মান্যতাও দেয়, কিন্তু গাইডলাইনে বলা হয়, পরিবার বা পরিবারের অনুপস্থিতিতে কাছের বন্ধু এই মৃত্যুতে সম্মতি দিতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পিংকি ভিরানি নয়, কাছের বন্ধু হিসেবে চিহ্নিত করা হয় সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের নার্সদের। কিন্তু তাঁরা অরুণাকে যেতে দিতে রাজি হননি। সেই অরুণাকে বেঁচে থাকতে হয়। পরে ‘কমন কজ’ নামে এক এনজিও-র করা জনস্বার্থ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট মান্যতা দেয় যে, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে, সম্মানের সঙ্গে মৃত্যু মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে।

সেই নির্দেশের উপর ভিত্তি করেই হরীশ রানারও সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুতেও অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। চারতলা থেকে পড়ে যাওয়ার পর থেকেই কোমায় চলে যান হরীশ রানা।  ১৩ বছর ধরে সেভাবেই ছিলেন। পাইপ দিয়ে ফুসফুসে ঢোকানো হত অক্সিজেন, নল দিয়ে ঢোকানো হয় খাবার। চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই অবস্থা থেকে হরীশের ফেরার আর কোনও আশা নেই। প্রতিদিন ছেলেকে এভাবে পড়ে থাকতে দেখাটা ক্রমশ কষ্টকর হয়ে উঠছিল বাবা-মায়ের কাছে। তাঁরা প্রশ্ন তোলেন, এভাবে আটকে রাখার কী মানে? হাইকোর্টে গিয়ে ফিরে যেতে হয় তাঁদের। সুপ্রিম কোর্টে গিয়েও ফিরতে হয়। তারপর আবার আবেদন করেন। এরপর শুরু হয় আইন লড়াই। বোর্ড গঠন করে শারীরিক অবস্থা খতিয়ে দেখার পর সুপ্রিম কোর্ট এই নিষ্কৃতির সম্মতি দেয়।

বিচারপতিরাও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এই রায় দিতে গিয়ে। সংস্কৃত লাইন উদ্ধৃত করে বিচারপতি রায়ে লিখেছেন, ‘সজীব দহতে চিন্তা, নির্জীব দহতে চিতা’, অর্থাৎ মৃত ব্যক্তিকে যখন আগুন দেওয়া হয়, তখন জীবিত ব্যক্তির মানসিক দহনও কিছু কম হয় না। কেন্দ্রীয় সরকারকে এই বিষয়ে আইন তৈরি করার পরামর্শও দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

গাইডলাইন মেনে এইমসে নিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে সব সাপোর্ট খুলে নেওয়া হবে হরীশ রানার। ধীরে ধীরে চিরঘুমে চলে যাবেন ৩১-এর হরীশ। বুকে পাথর চেপে এইটুকু শান্তিই বোধহয় তাঁকে দিতে চেয়েছেন বাবা-মা।

Follow Us