indian parliament: আমাদের সংসদের প্রয়োজন কেন?
constitution amendment bill: ফলে একটি প্রস্তাব, যা বিরোধিতার চেয়ে স্পষ্টতই বেশি সমর্থন পেয়েছিল, তা কিন্তু আইনে পরিণত হতে পারল না। প্রথম দর্শনে বিষয়টি অদ্ভুত বা বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে, তবে বস্তুত একটি কার্যকর ও সার্বভৌম সংসদ থাকার আসল তাৎপর্য এখানেই।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কেন্দ্রের সরকার সংসদের কক্ষে এক ঐতিহাসিক প্রস্তাব পেশ করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল লোকসভার মোট আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে এক ধাক্কায় বাড়িয়ে ৮৫০ করা।
ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হল। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেন ২৯৮ জন সাংসদ, আর বিপক্ষে পড়ল ২৩০টি ভোট।
সাধারণ হিসেব অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’-এর পাল্লা ‘না’-এর চেয়ে ভারী। বেশিরভাগ সাধারণ ভোটাভুটিতে একেই স্পষ্ট জয় হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। অথচ এতদসত্ত্বেও প্রস্তাবটি খারিজ হয়ে গেল!
কিন্তু কেন? কারণ এটি কোনও সাধারণ আইনি বিল ছিল না; এটি ছিল দেশের সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব। আর ভারতীয় সংবিধান পরিবর্তন করা সাধারণ নিয়ম পাসের মতো অতটা সহজ নয়। এর জন্য কেবল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট নয়; কক্ষে উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সম্মতি আবশ্যিক।
সেদিন লোকসভায় মোট ৫২৮ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। হিসেব অনুযায়ী, সেই সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ দাঁড়ায় প্রায় ৩৫২-তে। সেখানে শাসক দল পেয়েছিল ২৯৮টি ভোট—অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে ঠিক ৫৪টি ভোট কম।
ফলে একটি প্রস্তাব, যা বিরোধিতার চেয়ে স্পষ্টতই বেশি সমর্থন পেয়েছিল, তা কিন্তু আইনে পরিণত হতে পারল না। প্রথম দর্শনে বিষয়টি অদ্ভুত বা বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে, তবে বস্তুত একটি কার্যকর ও সার্বভৌম সংসদ থাকার আসল তাৎপর্য এখানেই।
সহজ ভাষায় বিষয়টি বুঝে নেওয়া যাক। ভারত রাষ্ট্রের যাবতীয় আইন তৈরির মূল কারিগর হল সংসদ। এর রয়েছে দুটি কক্ষ। প্রথমটি লোকসভা, যেখানে আমজনতা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে তাঁদের প্রতিনিধিদের নির্বাচন করে পাঠান। অন্যটি রাজ্যসভা, যেখানে বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন—যাতে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজ্যগুলোর কণ্ঠস্বর ও স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে।
দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ আইন পাসের ক্ষেত্রে সংসদে কেবল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়—অর্থাৎ বিপক্ষের চেয়ে পক্ষের ভোট বেশি হলেই কাজ শেষ। এভাবেই প্রতিদিনের প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা ও আইন প্রণয়ন করা হয়।
তবে সংসদ কেবল বিলে সিলমোহর দেওয়া বা ভোটাভুটির জায়গা নয়। এটি এমন এক মঞ্চ, যেখানে দেশের সরকারকে নিজের সমস্ত কাজের কৈফিয়ত দিতে হয়। সংসদীয় অধিবেশন চলাকালীন ‘প্রশ্নোত্তর পর্বে’ (Question Hour) যে কোনও মন্ত্রীকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো যায় এবং সর্বসমক্ষে তাঁদের প্রতিটি কথা রেকর্ডভুক্ত করা হয়। অন্যদিকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাংসদদের নিয়ে গঠিত সংসদীয় কমিটিগুলো যে কোনও বিল আইনে পরিণত হওয়ার আগে সেটির প্রতিটি ধারা ধরে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে। এই সমগ্র প্রক্রিয়ার কিছুই কিন্তু রুদ্ধদ্বার কক্ষে গোপনে ঘটে না; বরং এটি চালিত হয় জনসমক্ষে, যা সাধারণ নাগরিকেরা দেখতে, পড়তে এবং মূল্যায়ন করতে পারেন।
কিন্তু কিছু কিছু সিদ্ধান্তের পরিধি সাধারণ প্রশাসনিক রুটিনের চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক ও গভীর। সংবিধান সংশোধন তেমনই এক সিদ্ধান্ত। ভারতের সংবিধান কেবল একটি আইনগ্রন্থ নয়; এটি দেশের সমস্ত আইনের ভিত্তি ও চালিকাশক্তি। শাসক দল সামান্য মেজরিটি পাওয়ার জোরেই যদি মূল সংবিধানকে ইচ্ছামতো বদলে দেওয়ার অধিকার পেয়ে যেত, তবে যেকোনও দল নির্বাচনে সামান্য ব্যবধানে জিতে পুরো দেশের মৌলিক কাঠামোই বদলে ফেলার চেষ্টা করত। আবার পরবর্তী সময়ে অন্য দল ক্ষমতায় এলে তা ফের উল্টে দিত। ফলে দেশে কোনও নীতিই চিরস্থায়ী হতে পারত না।
ঠিক এই কারণেই ভারতের সংবিধান নিজেকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা নিজেই করে রেখেছে। মূল সংবিধান পরিবর্তন করতে হলে চাই সর্বজনীন ও বিস্তৃত সম্মতি—কেবল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (Two-Thirds Majority)। এর ফলে দেশের মূল কাঠামোয় পরিবর্তন তখনই আনা সম্ভব, যখন কেবল শাসক দল নয়, বরং সংসদের সিংহভাগ সদস্য সেই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন।
এপ্রিলের ভোটাভুটিতে ঠিক এই দৃশ্যই দেখা গিয়েছে। সরকারের যুক্তি ছিল—২০২৩ সালে সংসদে নারী আসন সংরক্ষণের যে ঐতিহাসিক নীতি গৃহীত হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত করতেই এই আসন সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব আনা জরুরি। বিরোধী দলগুলোর অনেকেই নারী সংরক্ষণের এই নীতি সমর্থন করলেও, কীভাবে আসন পুনর্নির্ধারণ করা হবে সেই পদ্ধতি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো, যারা বিগত কয়েক দশকে সাফল্যজনকভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাদের আশঙ্কা ছিল আসন সংখ্যা পুনর্বণ্টনে তারা উত্তর ভারতের দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া রাজ্যগুলোর তুলনায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়বে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বিঘ্নিত হবে। উভয় পক্ষই এমন একটি বিষয় নিয়ে যুক্তি তুলে ধরেছিল, যা দেশের ক্ষমতা বণ্টনের সার্বিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই বিলটি পরাজিত হয়েছে—তার কারণ এটা নয় যে বেশিরভাগ সাংসদ ভোটাভুটির বিরোধিতা করেছিলেন; বরং কারণ এটাই যে, ভারতের মূল কাঠামোর পরিবর্তন কেবল ‘অধিকাংশের’ ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
সংসদ আসলে এই কাজের জন্যই গঠিত। সরকার যা চাইবে, তা চোখ বন্ধ করে দ্রুত এবং নিভৃতে পাস করিয়ে নেওয়া সংসদের উদ্দেশ্য নয়। সংসদ নিশ্চিত করে যে, দেশের সংবিধানে বড় কোনও বদল আনার আগে সমগ্র দেশের মানুষের প্রতিনিধিরা যেন সত্যিই তাতে একমত হতে পারেন।
একটি দল নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করতেই পারে। তবে তার মানে এই নয় যে, দেশকে নিজের মতো করে নতুন রূপ দেওয়ার প্রতিটি তর্কে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জিতে যাবে।
তাই পরবর্তীতে যখনই কোনও খবরের শিরোনামে দেখবেন যে “সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন থাকা সত্ত্বেও বিলটি বাতিল হল”, বুঝবেন এটি কোনও প্রশাসনিক ভুল বা ব্যবস্থার ত্রুটি নয়—বরং দেশের সংবিধান ঠিক যেভাবে তৈরি করা হয়েছিল, একদম সেই নিয়মেই নিখুঁতভাবে কাজ করে চলেছে।
Sources: LiveLaw, “Lok Sabha Rejects Constitution (131st) Amendment Bill, 2026 To Increase Seats”; The Wire, “Modi Govt’s Constitution Amendment Bill on Delimitation Fails in Lok Sabha”; PRS Legislative Research, “The Delimitation Bill, 2026”; Constitution of India, Article 368.
