
কলকাতা: বাংলায় এসে তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ৩৫ পাতার ‘চার্জশিট’ প্রকাশ করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। নিউ টাউনের হোটেল থেকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে শাহর এই চার্জশিট পেশ। অমিত শাহর কথায়, “আমাদের চার্জশিট নিয়ে তৃণমূল যতই বলুক, এটা বিজেপির চার্জশিট। আসলে এটা তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে বাংলার জনগণের দেওয়া চার্জশিট। যেটার রূপ দিচ্ছে বিজেপি।” চার্জশিটে দুর্নীতি, নারী সুরক্ষা, শিল্প থেকে স্বাস্থ্য, ১৫ বছরে তৃণমূলে পারফরমেন্স তুুলে ধরেন তিনি।
‘ভরসার সরকার বাছুন’
শাহ বলেন, “গোটা দেশের সুরক্ষা বাংলা নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত। বাংলার মানুষকেই বাছতে হবে, ভয়কে বেছে নিতে হবে নাকি ভরসাকে। গত ১৫ বছর ধরে ভয়, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, বিভেদের রাজনীতি চলছে। বিজেপি ২০১১ সাল থেকেই এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, এবার বাংলার মানুষ বিজেপি সরকারই বানাবে।” সিন্ডিকেটরাজ, দুর্নীতির তো বটেই, তবে এদিনও শাহ প্রতিবারের মতো অনুপ্রবেশ ইস্যুর ওপরেই জোর দেন। তাঁর অভিযোগ, “অনুপ্রবেশকারীদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়, এর থেকে তো বামেদের শাসন ভাল ছিল।”
অনুপ্রবেশ ইস্যু
শাহ এদিন স্পষ্ট করে দেন, বিজেপি-র এজেন্ডা অনুপ্রবেশকারীদের তাড়ানো। শাহর কথায়, “কেবল ভোটার তালিকা থেকে নয়, দেশ থেকেই এক এক অনুপ্রবেশকারীদের বরে করে দেওয়ার জন্য আমরা সংকল্পবদ্ধ। এটা বাংলার মানুষকে নিশ্চিত করে বলে দিতে চাই। এটাই বিজেপি এজেন্ডা।” তিনি বলেন, “অনুপ্রবেশ কেবল দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় প্রশ্ন তেমনটা নয়, অনুপ্রবেশকারীরা আমাদের দেশের গরিব মানুষের ভাতেও থাবা বসাচ্ছে। তাই তাদের দেশ থেকে তাড়াবই।”
বিজেপি এলে ৪৫ দিনে BSF-কে জমি
অনুপ্রবেশ ইস্যুতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এর আগেও এই একই অভিযোগ তুলেছেন শাহ। রাজ্য জমি দিচ্ছে না BSF-কে-এদিনও সেই অভিযোগই তোলেন। অনুপ্রবেশকারী প্রসঙ্গে শাহ বলেন, ‘‘এত অনুপ্রবেশকারী ঢুকছে, মমতাজির সরকার কি ঘুমোচ্ছে? প্রশ্ন তুলবেন, বিএসএফ কী করছে? বিএসএফ তখনই কিছু করতে পারবে, যখন আপনি সীমান্তে বেড়া লাগাতে দেবেন। বিজেপি ক্ষমতায় আসার ১৫ দিনের মধ্যে সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জমি এ রাজ্যের বিজেপি সরকার কেন্দ্রকে দেবে।’’
শাহর কথায়, “বিজেপি তখনই ভূমিকা নিতে পারবে, যখন সীমান্তে কাঁটা তার বসানোর জন্য জমি দেয় রাজ্য। ৬০০ কিলোমিটার উন্মুক্ত রয়েছে। ৬ মাসে বিজেপি সরকার হবে বাংলায়। ৪৫ দিনের মধ্যে কাঁটা তার বসানোর জন্য যে জমির প্রয়োজন, সেটা ভারত সরকারকে বাংলার বিজেপি সরকার দেবে। অনুপ্রবেশকারীদের রোখা হবে।”
পরিসংখ্যান দিয়ে বিজেপির ভোট বৃদ্ধির তথ্য
বাংলায় বিজেপির ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার তথ্য দেন শাহ। ২০১৪ সালে ১৭ শতাংশ ভোট ছিল লোকসভা নির্বাচনে। আসন ২টি। ২০১৯ সালে বিজেপি ৪১ শতাংশ হয়, ১৮টা আসন পায়। ২০২৪ সালে বিজেপি ৩৯ শতাংশ ভোট পায়, আসন পায় ১২টি। শাহর কথায়, “এখানে বিজেপি ৪০ শতাংশ ভোট পাওয়ার একটা বেস তৈরি করে রেখেছে।” অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে এখন বিজেপির ৪০ শতাংশ শেয়ার। বিধানসভা নির্বাচনের পরিসংখ্যান নিয়ে শাহ বলেন, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ১০ শতাংশ ভোট ছিল, তিনটি আসন পেয়েছিল বিজেপি। কিন্তু ২০২১ সালে ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ৭৭টি আসন পেয়েছে বিজেপি।
বাংলার ‘ভয়মুক্তির নির্বাচন’
শাহ বলেন, “এটা বাংলার মুক্তির নির্বাচন। বাংলার একটা সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আর্টিফিসিয়াল ডেমোগ্রাফি পরিবর্তনের কারণে ভয়ে রয়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, পাছে ওঁরা নিজের দেশেই না সংখ্যালঘু হয়ে যায়। এটা সম্মান, জীবনের গ্যারেন্টির নির্বাচন।”
‘ভিক্টিম কার্ড’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ভিক্টিম কার্ড’-এর রাজনীতি করেন বলে অভিযোগ করেছেন শাহ। শাহর কথায়, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই এখানে ভিক্টিম কার্ডের রাজনীতি খেলেন। কখনও পা ভেঙে ফেলেন, কখনও কপালে পট্টি বেঁধে নেন। কখনও অসুস্থ হয়ে পড়েন, কখনও আবার কমিশনের সামনে বেচারা সেজে, কমিশনকে গালি দেন। কিন্তু বাংলার মানুষ এই ভিক্টিম কার্ডের রাজনীতিকে খুব ভালো ভাবে বুঝে গিয়েছে। কমিশনকে গালি দেওয়া বাংলার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে।”
SIR বিতর্ক
এসআইআর-এ বাংলার পরিস্থিতি বলতে গিয়ে শাহ বলেন, “অনেক জায়গায় এসআইআর হচ্ছে, কোথাও কোনও জুডিশিয়াল অফিসারের প্রয়োজন পড়েনি। এই নির্বাচনের আবহেই তামিলনাড়ু, কেরলেও এসআইআর হয়েছে। কোনও কোটকেস হয়নি। তামিলনাড়ুতে DMK সরকার, কেরলে কমিউনিস্ট সরকার। বাংলায় এমন কী হল? সুপ্রিম কোর্টকে জুডিশিয়াল অফিসার নিয়োগ করতে হল।”
‘বাংলায় মহিলা মুখ্যমন্ত্রী, অথচ মহিলারাই নিরাপদে নেই’
বাংলায় নারী নিরাপত্তা নিয়ে সওয়াল করতে গিয়ে আরজি কর কাণ্ড থেকে সন্দেশখালি, কসবা ল’কলেজের ঘটনা-সবই ছুঁয়ে যান শাহ। তিনি বলেন, “বাংলায় মহিলা মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু বাংলায় মহিলাদের অবস্থা গোটা দেশের মধ্যে সব থেকে খারাপ।” পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, “৩৪ হাজার ৭৩৮ টি মহিলাদের ওপর নির্যাতনের মামলা রয়েছে। তৃণমূলের কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা মহিলাদের ওপর অত্যাচারের অভিযোগের মামলায় প্রকাশ্যেই ‘রক্ষাকবচ’ দেওয়া হয়েছে। আরজি করের মামলায় যে অভিযুক্তদের উকিল, তাদের পুরস্কার স্বরূপ রাজ্যসভা দেওয়া হয়।”
অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গে এক সরকার আনার কথা বলেছেন শাহ। তাঁর কথায়, ‘‘অনেক বছর পর বাংলা বিহার ওড়িশায় একই দলের সরকার হতে চলেছে।’’
এদিনের কথায় শাহর মুখে একাধিকবার শুভেন্দু অধিকারীর নাম উঠে আসে, চার্জশিট পেশের সময়েও তিনি শুভেন্দুর কথা বলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কথায়, এটা যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ।