
কলকাতা: দলের অন্দরেই অস্বস্তিতে প্রবীণ সিপিএম নেতা বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য (Bikash Ranjan Bhattacharya)। প্রাক্তন শাসক দল তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়িকার হয়ে মামলা লড়ায় আক্রমণ-সমালোচনার মুখে পড়েছেন বিকাশ। তিনি নিজের স্বপক্ষে যুক্তিও দিয়েছেন। তারপরও তাঁকে দলের তরুণ তুর্কিদের থেকে শুরু করে বিরোধী দলের নেতাদের আক্রমণের মুখে পড়তে হল।
রাজারহাট-গোপালপুরের প্রাক্তন বিধায়িকা অদিতি মুন্সি (Aditi Munshi)-র বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেছিলেন বিজেপির বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি (Tarunjyoti Tiwari)। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনী হলফনামায় অদিতি সঠিক তথ্য দেননি। বিপুল সম্পত্তির হিসাব দেননি। জমি বিক্রির তথ্য উল্লেখ নেই হলফনামায়। সরকার বদলাতেই এখন আয় বহির্ভূত সম্পত্তি ও হলফনামায় সম্পত্তির তথ্য গোপন করার অভিযোগে গ্রেফতারির আশঙ্কা করছেন অদিতি মুন্সি ও তাঁর স্বামী দেবরাজ চক্রবর্তী। তাঁদের হয়েই মামলা লড়ছেন আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য।
মামলা লড়ার স্বপক্ষে বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেছেন, “মামলা লড়ব না? আইনজীবী হয়ে আমার কাছে যদি কোনও বিচারপ্রার্থী আসেন, তাদের বলব না না মশাই আপনি সিপিএম করেন না কেন?
তাহলে কি মমতা-অভিষেক এলেও কি তাদের হয়ে মামলা লড়বেন? সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “অভিষেক-মমতা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। এরা বিজেপির নেতৃত্বে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভাবে দুর্নীতি করেছে। এরা তো চুনোপুঁটি। ইতিপূর্বেই আমি মুকুল রায়ের হয়ে মামলা লড়েছি। উনি তো তৃণমূল থেকে বিজেপি হয়েছিলেন, বিজেপি থেকে তৃণমূল হন। সব্যসাচী দত্তের হয়ে মামলা করেছি। ওরা রাজনৈতিক ভাবে জামা পালটাতে পারে, কিন্তু আমার যে পেশাগত আদর্শ হল, যে আসবেন, তাদের সঙ্গে যদি দর্শনগত ভাবে বিরোধ না হয়, তাহলে আমি মামলা লড়ব।”
অদিতির হয়ে মামলা লড়া নিয়ে বিজেপির আক্রমণের জবাবে তিনি বলেন, “বিজেপির মধ্যে মস্তিষ্কের ঘাটতি হলে কিছু বলার নেই। বিজেপি নেতার যদি হার্ট অ্যাটাক হয়, তাহলে উনি কি ডাক্তারকে প্রশ্ন করবেন যে আপনি সিপিএম করেন না বিজেপি করেন? তাহলে তো কোনও ডাক্তার খুঁজে পাবেন না। কী হবে ওদের?”
এদিকে, নাম না করে বিকাশ ভট্টাচার্যকে আক্রমণ করেন তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দীর্ঘ পোস্ট করে লেখেন, “একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী, যিনি প্রায়শই নিজেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অগ্রণী যোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরেন, সেই তিনি এখন দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগে বিদ্ধ এক প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক এবং তাঁর স্বামীর পক্ষে আদালতে সওয়াল করছেন। অথচ তিনিই, সেই ভদ্রলোক আদালতে যুক্তি দেন, যে ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরি পেয়েছেন। এই বৈপরীত্য বিস্ময়কর। এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান তাঁকে ভবিষ্যতে দুর্নীতির প্রসঙ্গে নৈতিকতার আসনে বসার যে দাবি করেন সেই ব্যক্তি, তাঁকে সেখান থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করা উচিত। পেশাগত দায়িত্বের কথা সবসময় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। একদিকে নির্দিষ্ট পক্ষকে নিশানা করা হয়, আর অন্যদিকে একই ধরনের অভিযোগে অভিযুক্তদের পক্ষে সওয়াল করা হয়।এই ঘটনাপ্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে— বিজেপি ও সিপিআই(এম)-এর মধ্যে কি কোনও অন্তর্নিহিত বোঝাপড়া বা সমঝোতা রয়েছে?”।
নাট্যকার তথা সিপিএম সমর্থক সৌরভ পালোধিও ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছেন, “যে পার্টির চুরি আর দুর্নীতির জন্য আপনারা পার্টির হাজার হাজার কর্মী খুন হলো, তাদের চুরি যে চুরি নয়, এটা প্রমাণ করতে আপনি কোর্টে লড়বেন? এটাকে আবার আপনি আপনার ‘কাজ’ বলে ন্যারেটিভ সেট করবেন। এটা কেমন কমরেডশিপ। আমরা রইলাম আমাদের আদর্শ আঁকড়ে। পার্টির খারাপ সময় থেকে পার্টির সমর্থক। জিতেছে বলে আখের গোছানোর জন্য পার্টি সমর্থক হইনি। আমরা রইলাম সিপিএম আঁকড়ে। আপনি প্রার্থী ছিলেন অনেকবার। আপনি আপনার শত্রু শিবিরের হয়ে কোর্টে সওয়াল করবেন? আপনার শুধু ‘কাজ’ আছে। সুদীপ্ত, মইদুলের কোনো ‘কাজ’ ছিল না।”
সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষও এক সিপিএম সমর্থকের পোস্ট শেয়ার করেন যেখানে তিনি নিজের বাবার কথা লিখেছেন। পেশায় রিক্সাচালক তিনি, তা সত্ত্বেও তিনি টাকার জন্য ভোটের দিন কংগ্রেসের নেতার হয়ে রিক্সা চালাননি।
ওই সিপিএম সমর্থক লিখেছেন, “পেশাগত দর্শন (Professional Ethics)-কে বলে বলে গোল দিয়েছে বাবার ‘চেতনা’।”