
কলকাতা: নেতার চেয়ে নীতি বড়, ব্যক্তির চেয়ে বড় দল। সংক্ষেপে, মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টিতে এটাই সারকথা। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা মেনে চলা সিপিএমে পার্টি লাইনের সঙ্গে বিভিন্ন সময় ভিন্ন মত তৈরি হয়েছে নেতা-নেত্রীদের। কিন্তু কঠোর অনুশাসনের নিগড়ে বাঁধা সিপিআইএম বরাবরই অটল থেকেছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়ে মান্যতা দলীয় লাইনেই। তার ফলে অনেক সময় বহিষ্কৃত হতে হয়েছে বহু বড় বড় নেতাকে, বহু বড় বড় লাল-ঝান্ডাধারীকেও। তবে দলীয় লাইনের সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে আগ বাড়িয়ে দল ছেড়ে দেওয়ার নজিরও সিপিএমে রয়েছে।
এই মুহূর্তে বঙ্গ সিপিএমের তরুণ ব্রিগেডের অন্যতম মুখ প্রতীক-উর রহমান দল ছাড়ার পর ফের প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে পুরো বিষয়টি। প্রতীক-উর নিজে তাঁর পদত্যাগপত্রে সুনির্দিষ্ট ভাবে কারণ উল্লেখ না-করলেও সেলিম-হুমায়ুন ‘মনবোঝা’ পর্বের প্রেক্ষাপটে এসএফআই-এর প্রাক্তন রাজ্য সভাপতির এই সিদ্ধান্ত ঠিক কেন, তা বুঝে নিতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। আর এখানেই আলোচনায় চলে আসছে, আর কোন কোন ব্যক্তি সিপিআইএম ছেড়েছেন দলের সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে —
রেবতী মোহন দাস – দীর্ঘদিন ধরে ত্রিপুরার সিপিএম কর্মী। কিন্তু ২০১৬ সালে বামপন্থা ছেড়ে সরাসরি বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। এরপর ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচন বিজেপির বিরাট জয়। ওই বছর টিকিট পেয়ে প্রতাপগড় আসন থেকে বিধায়ক হিসাবে নির্বাচিত হন রেবতী মোহন।
কে এস মনোজ – কেরলের আলাপ্পুঝারের প্রাক্তন সিপিএম সাংসদ। কিন্তু ধর্মচারণ পালন করতে না-পারার অভিযোগ তুলে ২০১০ সালে দল ছেড়ে দেন তিনি। সেই সময় তাঁর অভিযোগ ছিল, তিনি ঈশ্বরবিশ্বাসী, কিন্তু পার্টি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকে দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে, যা তাঁর পক্ষে অসম্ভব।
পি আইশা পট্টি – কেরলের কোট্টারাকারা কেন্দ্রের তিনবারের হেভিওয়েট সিপিআইএম বিধায়ক। গত মাসের ১৩ তারিখ দল ছাড়েন তিনি। তারপরেই যোগ দেন কংগ্রেসে। দল ছাড়ার নেপথ্য়ে যুক্তিও কিছুটা একরকম। মতবিরোধ ও কোণঠাসা হয়ে থাকতে আর পারছিলেন না তিনি। তাই সেই সংঘাতের কারণেই এমন সিদ্ধান্ত। যদিও আইশার দল ছেড়ে যাওয়াকে সিপিআইএম ‘স্বার্থান্বেষী’ মানসিকতা বলে দাগিয়েছে।
সুজা চন্দ্রবাবু – কোল্লাম জেলা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে সিপিএম-এর কর্মী। কিন্তু তাঁর চোখে দল নাকি যথেষ্ট ‘সেকুলার’ নয়। তাই গত ২২ জানুয়ারি সিপিআইএম ছেড়ে তিনি গিয়ে যোগদান করেন ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগে।
সিন্ধু জয় – দলে কোণঠাসা অনুভব করতেন। সিপিএম নেত্রী, ছাত্র পরিষদ এসএফআই-এর জাতীয় সহ-সভাপতি। কিন্তু নিমেষে সব ছেড়ে চলে যান তিনি। ২০১১ সালে সিপিআইএমের হাত ছাড়েন সিন্ধু জয়। পরবর্তীতে দলও তাঁকে বহিষ্কার করে। এরপর কংগ্রেসে যোগদান।
নাম রয়েছে, কিন্তু নেই বাংলা? বাংলায় কি পদত্যাগের তুলনায় বহিষ্কারের বহর বেশি? ঠিক তা নয়। এই মর্মে সৈফুদ্দিন চৌধুরী, সমীর পুততুন্ডদের মতো নেতাদের কথা বারংবার ভেসে আসে। মতবিরোধ, দলের লাইন ঠিক নেই বলে সিপিএমের হাত ছেড়েছিলেন তাঁরা। সফি-সমীররা আবার নিজের দলও খুলেছিলেন। কিন্তু তাঁদের এই দলছাড়া নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, তাঁদের প্রথমে বহিষ্কার করেছিল সিপিএম। তারপর দল ছেড়েছিলেন তাঁরা। কেউ আবার বলেন উল্টো কথা।