
কিছুদিনের মধ্যেই অবসর নেবেন রাজীব কুমার। পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ইতিহাসে রাজীব কুমারের নাম থেকে যাবে। প্রশাসন তাঁকে মনে রাখবে দক্ষ অফিসার হিসেবে। তবে বিতর্কের ছায়া কি পিছু ছাড়বে? এত চর্চিত অফিসার খুব কমই দেখেছে বাংলা। বাংলাদেশ সীমান্তে স্ট্রং নেটওয়ার্ক, রুর্কি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি পাওয়া রাজীব কুমার বারবার ফিরে এসেছেন শিরোনামে।
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে যে হাইপ্রোফাইল মামলার শুনানি হল, সেখানে রাজ্যের পুলিশকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেই তালিকায় রয়েছেন ডিজি রাজীব কুমারও। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট সরাসরি দাবি জানিয়েছে, ডিজি রাজীব কুমার, কলকাতার সিপি মনোজ ভার্মা সাসপেন্ড করা হোক, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হোক।
আইপ্যাক-তল্লাশির দিন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিলেন রাজীব কুমার, মনোজ ভার্মারা। তবে এটাই প্রথমবার নয়, দুঁদে অফিসার রাজীব কুমার আগেও জড়িয়েছেন বিতর্কে। তবে তাঁর দক্ষতা নিয়ে কখনও প্রশ্ন ওঠেনি।
বারবার বিতর্ক
একসময় বাম ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত রাজীব কুমার পরবর্তীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিতি পান।
২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের আগে রাজীব কুমারকে কলকাতা পুলিশের কমিশনার পদে নিযুক্ত করা হয়। ২০১৯ সালে সারদা চিটফান্ড মামলার তদন্তে তাঁর বাড়িতে পৌঁছয় সিবিআই। সেই সময় বাড়িতে ছিলেন না রাজীব কুমার।
পুলিশ কমিশনারের বাড়িতে সিবিআই হানার প্রতিবাদে সেই সময় রাস্তায় বসে ধরনা দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশের সেরা অফিসার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন রাজীব কুমারকে। তারপর থেকে পুলিশের শীর্ষপদে আর ফেরেননি তিনি। চার বছর পর আরও তাঁকে ডিজি-র দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সম্প্রতি যুবভারতীতে মেসি-র উপস্থিতিতে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাতে রাজীব কুমারের দিকে আঙুল ওঠে। মেসি-কাণ্ডের পর তৈরি হওয়া তদন্ত কমিটি রাজীব কুমারকে শোকজ করেছিল।
একের পর এক বড় পদে রাজীব কুমার
উত্তর প্রদেশের চন্দৌসি-র বাসিন্দা রাজীব কুমার। ১৯৮৯ ব্যাচের আইপিএস অফিসার তিনি। বারবার তাঁর নাম বিতর্কে জড়ালেও কেরিয়ার শুরুতে দক্ষ অফিসার হিসেবে উচ্চ প্রশংসিত হন তিনি।
একসময় এসটিএফ-এর শীর্ষ পদে ছিলেন তিনি। পরে বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার পদেও দায়িত্ব সামলান। ২০১৬ সালে কলকাতার পুলিশ কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হন রাজীব কুমার। ২০২৪-এ রাজ্য পুলিশের ডিজি পদে নিযুক্ত করা হয় রাজীব কুমারকে।
বাংলাদেশ ও নেপাল সীমান্তেও ছিল রাজীব কুমারের নেটওয়ার্ক
পশ্চিমবঙ্গে একাধিক পদে দায়িত্ব সামলালেও শুধুমাত্র রাজ্যে নয়, রাজীবের নেটওয়ার্ক ছিল দেশের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। নখদর্পণে ছিল বাংলাদেশ ও নেপাল সীমান্তও। জানা যায়, পশ্চিম এশিয়া পর্যন্ত তাঁর নেটওয়ার্ক ছিল। বিভিন্ন রাজ্যের এসটিএফ-এর সঙ্গে যোগাযোগ থাকায়, বাম আমলেও ভরসার জায়গায় ছিলেন রাজীব কুমার।
খাদিম কর্তা থেকে খাগড়াগড়, রাজীবের প্রোফাইলে কী কী মাইলস্টোন
খাদিম কর্তা অপহরণ থেকে শুরু করে ২০০২ সালে আমেরিকান সেন্টার হামলার সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল রাজীব কুমারের।
শুধু তাই নয়, মমতা সরকারের আমলে মাওবাদী দমনে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলায় প্রথম গ্রেফতারি তাঁর হাত ধরেই হয়েছিল। সম্প্রতি সন্দেশখালির ঘটনার পর বেপাত্তা শাহজাহান শেখের গ্রেফতারিতেও তাঁর ভূমিকাই উঠে আসে। তিনি সন্দেশখালি যাওয়ার পরের দিনই গ্রেফতার হন শাহজাহান।
সূত্রের খবর, তথ্য ও প্রযুক্তি দফতরের সচিব থাকার সময়েও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় একাধিক বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজীব কুমারের ওপর ভরসা করেছেন। শোনা যায়, আইপিএস পোস্টিং-এর ক্ষেত্রেও তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দিতেন মুখ্যমন্ত্রী।
রুর্কি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন রাজীব কুমার
চান্দৌসির বাসিন্দা রাজীব কুমার সেখানকার স্কুলেই পড়াশোনা শেষ করেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব রুর্কি, যা বর্তমানে আইআইটি, রুর্কি নামে পরিচিত, সেখানেই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যান রাজীব। কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন তিনি। তাঁর ভাই ও বোন দুজনেই পেশায় চিকিৎসক।
২০১৯-এ যখন রাজীব কুমারের বাড়িতে তল্লাশি চলে, সেই সময় মুন্নি দেবী গুপ্তা বলেছিলেন, “মেরা বেটা কোই গলত কাম নেহি করেগা (আমার ছেলে কোনও ভুল করতে পারে না)।” তিনি আরও বলেছিলেন, “আমার ছেলে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বিমান নামতে দেওয়া হয়নি বলে সিবিআই আমার ছেলেকে টার্গেট করছে।”
আগামী ৩১ জানুয়ারি ডিজি পদে রাজীব কুমারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। সেখানেও বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। রাজ্য সরকার ডিজি পদের নামের জন্য এত দেরীতে তালিকা পাঠিয়েছে যে তা ফেরত পাঠিয়েছে ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (UPSC)। পাশাপাশি, এই বিষয়ে উপযুক্ত নির্দেশের জন্য রাজ্য সরকারকে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।