
কলকাতা: কয়েকমাস আগে বিধানসভা নির্বাচনে গেরুয়া ঝড় দেখেছে বাংলা। সেই ঝড়ের পর থেকেই কি বাংলায় ছন্নছাড়া বিরোধীরা? একদিকে, তৃণমূল দুই শিবিরে বিভক্ত। রাজ্যের দুই আসনে উপনির্বাচন ঘিরে বামফ্রন্টেও মনোমালিন্য সামনে এসেছে। আইএসএফ-ও বামেদের উপর ‘গোঁসা’ করে নন্দীগ্রামে প্রার্থী দিয়েছে। আবার উপনির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসের প্রস্তাব খারিজ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুই আসনে উপনির্বাচন কি বাংলায় বিরোধীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে?
বাংলার দুই আসনে উপনির্বাচনের ফলাফলে সরকারের স্থায়িত্বে কোনও প্রভাব পড়বে না। তারপরও পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম ও মুর্শিদাবাদের রেজিনগরের উপনির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল বাড়ছে। কয়েকমাস আগে নন্দীগ্রাম থেকে জিতেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ভবানীপুর থেকেও তিনি জেতেন। পরে ভবানীপুর আসনটি রেখে নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ ছাড়েন। অন্যদিকে, নওদার পাশাপাশি রেজিনগর থেকে জিতেছিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির সুপ্রিমো হুমায়ুন কবীর। তিনি নওদা আসনটি রেখে রেজিনগরের বিধায়ক পদ ছাড়েন।
ছাব্বিশের নির্বাচনের ফলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে নন্দীগ্রাম আসনে এগিয়ে থেকেই শুরু করছে বিজেপি। স্বয়ং শুভেন্দু অধিকারী বলছেন, রেকর্ড মার্জিনে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ জিতবেন নন্দীগ্রামে। রেজিনগরে হুমায়ুনের ছেলে প্রার্থী হয়েছেন। ফলে হুমায়ুনের দল ওই আসন ধরে রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনীতির কারবারিরা বলছেন, দুই আসনে উপনির্বাচন হলেও মূল লড়াই রেজিনগরেই। সেখানে বিজেপি কী ফল করে, সেদিকেই তাকিয়ে সবাই।
তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে এই নির্বাচন ঘিরে বিরোধীদের আকচা-আকচি। বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। এখন আর তৃণমূল বললে নির্দিষ্ট করে কাউকে চিহ্নিত করা যায় না। হয় কালীঘাট তৃণমূল। নয়তো ঋতব্রত তৃণমূল। তৃণমূলের দুই শিবিরই নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে প্রার্থী দিয়েছে। দুই শিবিরই দাবি করেছে, ঘাসফুল প্রতীক তাদের। এখন কারা তৃণমূল প্রতীকে লড়বে, তা নিয়ে চোরাস্রোত বইছে দুই শিবিরেই। ফলে উপনির্বাচনের প্রচারের চেয়েও তৃণমূলের দুই শিবিরের চিন্তা প্রতীক পাওয়া। ফলে তৃণমূলের দুই শিবির এই উপনির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের মনোমালিন্য-
আবার এই দুই আসনে উপনির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গেও কালীঘাট তৃণমূলের ‘দূরত্ব’ তৈরি হয়েছে। সূত্রের খবর, মমতার তরফ থেকে প্রস্তাব নিয়ে এক তৃণমূল নেতা কংগ্রেসের কেসি বেণুগোপালের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। উপনির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসন কংগ্রেসকে ছাড়তে চান মমতা। পরিবর্তে রেজিনগর তৃণমূলের জন্য ছেড়ে দেওয়ার আবেদন করেন। উপনির্বাচনে মমতার আসন সমঝোতার প্রস্তাব মানেনি কংগ্রেস। মমতার অনুরোধ উপেক্ষা করে একতরফা ২ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে কংগ্রেস।
বাম-কংগ্রেস আসন সমঝোতা আর হবে কি না, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন-
কালীঘাট তৃণমূলের সঙ্গে যেমন কংগ্রেসের মনোমালিন্য বেড়েছে, তেমনই বামেদের সঙ্গেও কংগ্রেসের ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়েছে। রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় থাকাকালীন একাধিক নির্বাচনে বাম ও কংগ্রেস আসন সমঝোতা করে লড়েছে। কিন্তু, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বামেদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেনি কংগ্রেস। রাজ্যে পালাবদলের পর বিজেপির বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়তে কংগ্রেস ফের বামেদের হাত ধরে কি না, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছিল। কিন্তু, বিজেপিকে টক্কর দিতে বামেদের হাত ধরেনি কংগ্রেস। এই নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রবীণ বাম নেতা তথা প্রাক্তন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যও বলছেন, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে বাম ও কংগ্রেসের জোট হলে ভালো হত।
বামেদের অন্দরে দ্বন্দ্ব-
এই উপনির্বাচন ঘিরে বামেদের শরিকি দ্বন্দ্বও সামনে এসেছে। রেজিনগরে প্রার্থী দিয়েছে সিপিএম। এতে গোঁসা হয়েছে আরএসপি-র। এই আসনে তারা প্রার্থী দিতে চেয়েছিল। তাদের বক্তব্য, প্রার্থী দেওয়া নিয়ে আলোচনায় ঐকমত্যে পৌঁছানোর আগেই প্রার্থী ঘোষণা করেছে সিপিএম। তাই, আরএসপি-ও তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে।
ছাব্বিশের নির্বাচনে বামেদের আর এক সঙ্গী আইএসএফ-ও সরব হয়েছে। নন্দীগ্রামে প্রার্থী দিল তারা। আইএসএফ নেতা তথা ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীর বক্তব্য, ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে প্রার্থী দিয়েছিলেন তাঁরা। আই উপনির্বাচনেও প্রার্থী দিতে প্রথম থেকেই আগ্রহী ছিলেন তাঁরা। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের সঙ্গে আলোচনাও করেন। নওশাদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে বামফ্রন্টের অন্দরে আলোচনা করে তাঁদের সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে তাঁদের কোনও কিছু না জানিয়েই বামেদের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। এরপর জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন তিনি।
রাজনীতির কারবারিরা বলছেন, উপনির্বাচনেই বিরোধীদের ছন্নছাড়া ছবি একেবারে স্পষ্ট। ভোটের ফল কী হবে, তা নিয়ে জল্পনা এখন অনেক পিছনে। বিরোধীদের জামানত জব্দ হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। এদিন নন্দীগ্রামে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথের মনোনয়ন জমার পথে সভা থেকে শুভেন্দু বলেন, “পিসিপন্থী, ঋতপন্থী, মহাশূন্যে বিচরণ করা বাম, অস্তিত্বহীন কংগ্রেস এদের বলব ১০ হাজার টাকা খরচ করে নমিনেশন করছেন, একটারও সিকিউরিটি মানি থাকবে না।” বিরোধীদের জামানত জব্দ হবে কি না, তা আগামী ৯ অক্টোবর ভোটের ফল ঘোষণার পর জানা যাবে। কিন্তু, বিরোধীদের মধ্যে যেভাবে খেয়োখেয়ি হচ্ছে, তাতে ভোটের পর রাজ্যে বিরোধীদের জমি আদৌ থাকবে কি না, সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।