
অগ্নিমিত্রা পাল থেকে দিলীপ ঘোষ। ভোটের আগেই রাজ্যে বেড়ে চলা হিংসা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন নির্বাচনে কমিশনের বিরুদ্ধে। এদিকে তৃণমূল তো আবার বারবরই এই কমিশনের সঙ্গেই বিজেপির আঁতাতের অভিযোগে সরব। তাহলে এখন হলটা কী বলুন তো! সমীকরণটা কোথাও ঘেঁটে যাচ্ছে? এদিকে ভোটের ঘোষণা হতে না হতেই মুখ্যসচিব থেকে স্বরাষ্ট্রসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি-সহ রাজ্য প্রশাসনের উপর তলায় একের পর এক বদল হয়েছে। বদলে দেওয়া হয়েছে একাধিক জেলাশাসক, ডিইও, পুলিশ সুপার এবং পুলিশ কমিশনারদের। এখানেই শেষ নয়, খাদ্য এবং পিডব্লিউডি-র মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতরের প্রধান সচিবদের মতো সিনিয়র অফিসারদের ভোটের পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে পাঠানো হয়েছে। ভুলে গেলে চলবে না বাংলার পাশাপাশি কিন্তু অসম, তামিলনাড়ু, পণ্ডিচেরি, কেরলামেও কিন্তু ভোট হচ্ছে। কিন্তু রদবদলের এই ব্যাপক ছবি কিন্তু খুব একটা সামনে আসেনি! কিন্তু বাংলায় কেন?
কমিশনের মূল লক্ষ্য একটাই—ভয়মুক্ত এবং অবাধ নির্বাচন। আর যে কোনও মূল্য তা করতে প্রস্তুত কমিশন। সে কথাই বারবার স্পষ্ট করেছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। যদিও ভোট ঘোষণা হলে সাধারণ মানুষের ভোটের লাইনে দাঁড়াতে এখনও প্রায় মাস খানেক বাকি! কিন্তু তাতে কী! কলকাতা থেকে জেলা, ভাঙড় থেকে পাটুলি, এখন থেকেই বোমা-গুলির শব্দে কেঁপে উঠছে একের পর এক এলাকা। ঝরছে রক্ত। যাচ্ছে প্রাণ। শুধু সাধারণ ভোটারই নয়, মার খেতে হচ্ছে খোদ পুলিশকেই। তাহলে অবাধ-শান্তিপূর্ণ নির্বাচন শব্দগুলো এবারও শুধু ওই সোনার পাথর-বাটি হয়েই থেকে যাবে?
ধরছে রক্ত, যাচ্ছে প্রাণ
আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাগাতার রাজনৈতিক হিংসা, খুন, বোমাবাজি এবং সংঘর্ষের উদ্বেগজনক খবর সামনে আসছে। এত কড়াকড়ি ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর রুটমার্চ সত্ত্বেও একের পর এক এই ধরনের ঘটনা রাজ্যের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। নির্বাচনের কাজে যুক্ত সরকারি কর্মী এবং পুলিশও রাজ্যে সুরক্ষিত নয়। নদিয়ার রানাঘাটে নির্বাচনী বিধিভঙ্গের প্রতিবাদ করায় এক ভোটকর্মীকে বিডিও অফিসের কর্মীদের হাতেই মারধর খেতে হয়েছে বলে অভিযোগ।
পাঁশকুড়াতেও কমিশনের নির্দেশ মেনে দলীয় পতাকা খুলতে গিয়ে দুষ্কৃতীদের হামলার মুখে পড়েন এক সরকারি কর্মী, ভাঙচুর করা হয় তাঁর গাড়ি ও মোবাইল। অন্যদিকে, বাসন্তীতে দুষ্কৃতীদের হামলায় এক এসআই-সহ ৫ কনস্টেবল গুরুতর জখম হয়েছেন। এই ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ডিজির কাছে আবার রিপোর্টও তলব করেছে কমিশন।
অন্যান্য়বারের মতো এবারও যে ভাঙড় ভাঙড়েই রয়েছে তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। লাগাতার আসছে হিংসার খবর। কয়েকদিন আগেই ভাঙড়ে দেওয়াল লেখাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও আইএসএফ কর্মীদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষের ছবি সামনে আসে। সঙ্গে ফ্রিতে বোমা উদ্ধার তো রয়েইছে।
পূর্ব মেদিনীপুরের এগরাতেও সাহাড়া গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় তৃণমূলের যুব সভাপতি সুদীপ্ত বাগের উপর হামলার অভিযোগ উঠেছে বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে। আবার হুগলির তারকেশ্বরে খোদ বিজেপি প্রার্থী সন্তু পানের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে শাসকদলের বিরুদ্ধে।
শুধু টুকটাক অশান্তি নয়। উঠেছে একেবারে খুনের অভিযোগও। দুই দলেই নানা প্রান্ত থেকে দলীয় কোন্দলে হিংসার ছবিও সামনে এসেছে। খড়দহে তো বিজেপির দলীয় বৈঠকেই ব্যাপক সংঘর্ষ যেখানে প্রার্থীকেও মারধরের চেষ্টা করা হয়। ৮ জন আহত হন। অন্যদিকে, উত্তর ২৪ পরগনার মিনাখাঁয় হাড়োয়ার তৃণমূল বুথ সভাপতি কাজী মসিউর রহমানের ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধারের পর ফের জোরালো হয়েছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অভিযোগ। একদিন আগেই একেবারে গ্যাংওয়ার দেখা যায় খাস কলকাতাতেও। পাটুলিতে ১০১ নম্বর ওয়ার্ডে ছাদের উপর মদ্যপানের আসরে বোমাবাজি ও গোলাগুলিতে রাহুল দে নামে এক তৃণমূল সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন জিৎ মুখোপাধ্যায় নামে আরও একজন। তাঁর সঙ্গেও জড়িয়েছে শাসকদলের নাম। এমনকী খোদ মেয়রের সঙ্গে ছবি নিয়েও জোর শোররোল।
অন্যদিকে কমিশনের রদবদল কিন্তু এখনও চলছেই। এবার রিটার্নিং অফিসারদেরও সরিয়ে দিয়েছে কমিশন। মোট ৭৩ জন রিটার্নিং অফিসারকে বদলি করা হয়েছে। তা নিয়েও চাপানউতোর চলছে। যদিও কটাক্ষ করতে ছাড়ছে না তৃণমূলও। কমিশনের বিরুদ্ধে লাগাতার সুর চড়াচ্ছেন ঘাসফুল শিবিরের নেতারা। সোজা কথায়, ভোটের আবহে এই লাগাতার হিংসা, অশান্তি ঠেকানো যে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে এক চরম অগ্নিপরীক্ষা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ, সবস্তরে যে তাঁদের নির্দেশেই বদলেছে প্রশাসনের টপ কমান্ড। যদিও কমিশন বারবারই বলছে সাধারণ ভোটারদের মনে নিরাপত্তা ও আস্থা ফেরানো, রাজনৈতিক সংঘর্ষ কঠোর হাতে দমন করা, সর্বোপরি প্রতিটি নাগরিকের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। যদিও শেষ পর্যন্ত বাংলার ভোট এই গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসহ কতটা শান্তিপূর্ণ হয় তা সময়ই বলবে।