মাওবাদী-অনুপ্রবেশ সবটাই নখদর্পণে! বোসকে সরিয়ে দুঁদে গোয়েন্দা রবিকে বাংলায় আনার পিছনে কোন অঙ্ক?
এক্স হ্যান্ডেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা পোস্ট অনুসারে রাজ্যে নতুন রাজ্যপাল হতে চলেছেন আরএন রবি। বোস গিয়ে রবি আসছেন বাংলায়? দুটো শব্দেই বাংলার আবেগ জড়িয়ে। কিন্তু এই দুটো নামের পিছনে আসলে কী ঘটছে বুঝতে গেলে, বর্তমান পরিস্থিতিটা একটু বুঝতে হবে।

‘আমি বাংলার দত্তক সন্তান হতে চাই।’ মাত্র মাস তিন আগে এ কথা বলে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার হওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন বোস। কোন বোস? যাঁর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের উঠতে-বসতে সংঘাত সেই বোস। শুধু তাই নয়, শুক্রবার দার্জিলিং রাজভবনে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করতে যাবেন বলে পরিকল্পনাও ছিল। কেন্দ্রীয় তথ্য-সংস্কৃতি মন্ত্রকের সেই অনুষ্ঠানের ইনভিটেশন কার্ডেও বোসের ছবি জ্বলজ্বল করছে। হঠাৎ ব্যাগ গুছিয়ে ছুটতে হল দিল্লি। তারপরই রেজিগনেশন। অদ্ভুত না? বাংলার বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন একটি ঘটনা কি সত্যিই সাধারণ? নাকি পিছনে রয়েছে জটিল অঙ্ক?
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রাজভবন ছাড়তে হচ্ছে সি ভি আনন্দ বোসকে। গত তিন বছরে যাঁকে বারবার পথে-প্রান্তরে বিভিন্ন ইস্যুতে মুখ খুলতে দেখা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাত থেকে তাঁর কোনও বক্তব্যই সামনে আসেনি। শুধু পিটিআই-কে বলেছেন, ‘অনেকগুলো দিন রাজভবনে কাটালাম’। যিনি ভোটার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, যিনি বাংলায় হাতেখড়ি করেছিলেন, তিনি কি এত তাড়াতাড়ি যাওয়ার কথা জানতেন? কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে তাঁর নাম রাখা হল কেন? কেনই বা তড়িঘড়ি সেই প্রোগ্রাম বাতিল করতে হল? উঠছে অনেকগুলো প্রশ্ন।
এক্স হ্যান্ডেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা পোস্ট অনুসারে রাজ্যে নতুন রাজ্যপাল হতে চলেছেন আরএন রবি। বোস গিয়ে রবি আসছেন বাংলায়? দুটো শব্দেই বাংলার আবেগ জড়িয়ে। কিন্তু এই দুটো নামের পিছনে আসলে কী ঘটছে বুঝতে গেলে, বর্তমান পরিস্থিতিটা একটু বুঝতে হবে।
সদ্য এসআইআরের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হয়েছে। ৬১ লক্ষের কিছু বেশি নাম বাদ পড়েছে। ৬০ লক্ষ ভোটারের নামের মীমাংসা হয়নি। সেগুলি মীমাংসা করে সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশ করার কথা। সব কাজ মেটাতে ভিনরাজ্য থেকে অন্তত ২০০ বিচারককেও আনা হতে পারে বাংলায়। তবে অঙ্কের হিসেব বলছে, অতিরিক্ত বিচারক আনলেও অত নামের মীমাংসা সময়ের মধ্যে করা কঠিন। সূত্রের খবর, এখনও পর্যন্ত ৬ লক্ষ ১৫ হাজার না যাচাই করা হয়েছে। বাকি ৫৪ লক্ষের নাম ভোটের আগে মীমাংসা হওয়া সম্ভব? যদি না হয়, তাহলে ভোট কি হবে? রাজ্যের মন্ত্রী-বিধায়কদের নাম রয়েছে ওই তালিকায়। মীমাংসা না হলে তো তাঁদের টিকিট দেওয়াই সম্ভব হবে না! সব লিস্ট প্রকাশ করে তবেই ভোট করতে হবে, এমন দাবি উঠছে বিভিন্ন মহলে।
এবার একটু সময়ের হিসেবটা দিই। আগামী ৭ মে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। অর্থাৎ ২ মাসের মধ্যে যা করার করতে হবে। ভোট শুরু হওয়ার এক মাস আগে ভোট ঘোষণা করতে হবে কমিশনকে। অর্থাৎ হাতে সময় খুব বেশি নেই। সে ক্ষেত্রে ৭ মে-র মধ্যে ভোট সম্পন্ন না হলে সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না বাংলায়। এই ক্ষেত্রে বছর খানেক আগে শুভেন্দু অধিকারীর করা একটি মন্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিতে চাইব। শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, “বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে ভোট করানো উচিৎ। শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের পক্ষে বাংলায় ভোট করানো সম্ভব হবে না, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করলে তবেই সবাই ভোট দিতে যেতে পারবেন।” যদিও শুভেন্দুর এই মন্তব্য এসআইআর শুরু হওয়ার অনেক আগের।
মনে হতেই পারে, রাজ্যপাল বদলে রাষ্ট্রপতি শাসনের জল্পনার কথা কেন বলছি? কারণ যাঁকে নতুন রাজ্যপাল করা হচ্ছে, তাঁর নামটা এই আবহে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আর এন রবি। প্রাক্তন আইপিএস, প্রাক্তন গোয়েন্দাকর্তা। তামিলনাড়ুতে রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা তাঁর ঝুলিতে। প্রশাসনিক দক্ষতা, তুখোড় বুদ্ধি- কোনওটা নিয়েই কোনও সন্দেহ নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে এমন একজন রাজ্যপালকে দায়িত্ব নিতে হবে যিনি প্রশাসনটা বোঝেন, সাংবিধানটা বোঝেন, সঙ্গে থাকবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও।
রবির ব্যাকগ্রাউন্ডটা একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, সবকটা প্য়ারামিটারেই তিনি কতটা তুখোড়। ফিজিক্সে এমএ করা আরএন রবি একসময় সাংবাদিকতা করেছেন। পরে আইপিএস হন। না কোনও ডিজি বা এসপি হিসেবে তাঁর কেরিয়ার এগোয়নি। সিবিআই ও ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। কাশ্মীর বা উত্তর-পূর্বের অনুপ্রবেশ থেকে মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকা-সবটাই তাঁর নখদর্পণে। এমনকী মোদী সরকারের অন্য়তম ভরসা তথা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের ডেপুটি হিসেবেও একসময় কাজ করেছেন তিনি। বাংলার অনুপ্রবেশ ইস্যু যখন বিজেপির বড় হাতিয়ার, তখন রবিকে পাঠানোর ভাবনা কি নিছকই সাধারণ বিষয়?
আর রাজ্য সামলানোর কথা যদি বলি, তাহলে খুব সাম্প্রতিক অতীতে ফিরে যেতে হয়। অ-বিজেপি শাসিত রাজ্য তামিলনাড়ুতে রাজ্যপাল হিসেবে বারবার শিরোনামে জায়গা করে নিয়েছেন এই দুঁদে গোয়েন্দা। তিন বছর ধরে রাজ্যপালের দফতরে স্তালিন সরকারের ১২টি বিল আটকে রেখেছিলেন তিনি। স্ট্যালিন সরকারের সঙ্গে সংঘাত চরমে পৌঁছয়। এমনকী তামিলনাড়ু সরকার রাজ্যপালের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। তারপরই সরকার ও রাজ্যপালের মধ্যে আইনি যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সে এক ঐতিহাসিক পরিস্থিতি। বিল আটকে রাখাকে ‘অবৈধ’ এবং “স্বেচ্ছাচারী” বলে সুপ্রিম কোর্ট। সেই রবি এবার সামলাবেন বাংলাকে। রাষ্ট্রপতি শাসনের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নয় তো?
অন্যরকম গন্ধ পাচ্ছে রাজ্যের শাসক দলও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সন্দেহ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক তাঁকে নির্দিষ্ট কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করানোর জন্য চাপ দিয়ে থাকে! আবার এই পরিস্থিতিতে বোসের সঙ্গে ধনখড়ের কথাও মনে করাচ্ছে তৃণমূল। ঠিক যেভাবে শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে উপরাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরে গিয়েছিলেন ধনখড়, একইভাবে অসুস্থতার কথা লিখেছেন বোসও।
তবে ৯ মার্চ রাজ্যে আসছে কমিশনের ফুল বেঞ্চ। দফায় দফায় বৈঠক হওয়ার কথা আছে। সাধারণত এমন বৈঠকের পরই ভোট ঘোষণা করে থাকে কমিশন। এবারও কি তাই হবে? ঘোষণা হলেও বিক্ষোভের আশঙ্কা, ঘোষণা না হলেও সঙ্কটের সম্ভাবনা। সামলাতেন পারবেন তো রবি? সেটা সময়ই বলবে।
