Exclusive: ‘জ্যোতি বসু আমার অনুপ্রেরণা’, হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তাক লাগিয়ে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিলশাদার
SFI-led alliance wins Hyderabad University election: হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে বামেদের জয় নিয়ে বাংলার রাজনৈতিক মহলেও কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে। দিলশাদাকে নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। এরই মধ্যে টিভি৯ বাংলার একগুচ্ছ প্রশ্নের উত্তর দিলেন হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দিলশাদা রায়হান।

কলকাতা: হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আম্বেদকর অডিটোরিয়াম। এক বছর আগে এই অডিটোরিয়ামের সামনে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। এবিভিপি জেতার পর তাঁর প্রশ্ন ছিল, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক ছাত্রছাত্রীরা এখন কীভাবে টিকে থাকবে? এক বছর পর সেই দিলশাদা রায়হানই হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতি। তাঁকে নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়েছে। পড়াশোনা- রাজনৈতিক ব্যস্ততার মাঝেও সময় করে টিভি৯ বাংলাকে ফোনে সাক্ষাৎকার দিলেন SFI নেত্রী দিলশাদা।
গত বছর হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ছয়টি প্রধান পদেই জিতেছিল এবিভিপি-এসএলভিডি জোট। এ বছর ছবিটা পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। ছয়টি প্রধান পদের মধ্যে পাঁচটিই গিয়েছে এসএফআই, এএসএ, এআইএসএ, ডিএসইউ এবং টিএসএফের জোটের দখলে। ব্যবধানের এই নাটকীয় পরিবর্তনের কারণ নিয়ে উঠে এসেছে একাধিক ব্যাখ্যা।
ভোটের হিসেব-
২৮ সেপ্টেম্বর হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোটগ্রহণ হয়। পরদিন ফল ঘোষণা করা হয়। মোট ৫,৯৪১ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৪,৬৪১ জন। ভোটদানের হার ৭৮.১ শতাংশ। সভাপতি পদে দিলশাদা রায়হান পেয়েছেন ২,১৭৮ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী এবিভিপি-এসএলভিডি জোটের নরেশ পি পেয়েছেন ১,৭২৭ ভোট। ব্যবধান ৪৫১।
সহ-সভাপতি হয়েছেন টিএসএফের কোররা নিতিন চৌহান। সাধারণ সম্পাদক পদে জিতেছেন এএসএ-র প্রতীক সাগর। যুগ্ম সম্পাদক হয়েছেন এআইএসএ-র সিদ্ধান্ত শাশ্বত। সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে জয় পেয়েছেন এএসএ-র অভিনাশ কুমার। ক্রীড়া সম্পাদকের পদটি অবশ্য ধরে রেখেছে এবিভিপি-এসএলভিডি।
গত বছরের সঙ্গে তফাত কোথায়?
২০১৯ সাল থেকে এসএফআই এবং এএসএ একসঙ্গে নির্বাচনে লড়ছিল। কিন্তু গত বছর দুই সংগঠন আলাদা প্রার্থী দেওয়ায় ভোট ভাগ হয়ে যায়। সেই নির্বাচনে ছয়টি প্রধান পদেই জয় পায় এবিভিপি-এসএলভিডি।
এ বছর পরিস্থিতি বদলে যায়। এসএফআই ও এএসএ ফের একসঙ্গে লড়ে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় এআইএসএ, ডিএসইউ এবং টিএসএফ। ফলে বৃহত্তর বিরোধী জোট তৈরি হয়। ক্যাম্পাসের নির্বাচনে এই জোটবদ্ধতাই ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাত্র পাঁচ ভোটের ব্যবধান-
সবচেয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে। মাত্র পাঁচ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন অভিনাশ কুমার। গণনার সময় দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ফল নিয়ে পুনর্গণনার দাবি তোলে এবিভিপি। এর জেরে ফল ঘোষণা আটকে যায়। ৩০ সেপ্টেম্বর ফল ঘোষণার দাবিতে উপাচার্যের দফতরের সামনে বিক্ষোভ দেখান জোটের ছাত্ররা। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিনাশ কুমারকেই বিজয়ী ঘোষণা করে। বিহারের প্রত্যন্ত গ্রামের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী অভিনাশ। তাঁর দাবি, তাঁর জেলা থেকে তিনিই প্রথম ক্লাসিক্যাল মিউজিকে স্নাতকোত্তর পড়ছেন।
টিভি৯ বাংলাকে কী বললেন দিলশাদা রায়হান?
হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে বামেদের জয় নিয়ে বাংলার রাজনৈতিক মহলেও কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে। দিলশাদাকে নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। এরই মধ্যে টিভি৯ বাংলার একগুচ্ছ প্রশ্নের উত্তর দিলেন হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।
প্রশ্ন: হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসএফআই ক্ষমতায় ফিরল। এই জয়ের সবচেয়ে বড় কারণ কী?
দিলশাদা: প্রথমত, বাম, আম্বেদকরপন্থী, দলিত ও আদিবাসী সংগঠনগুলির ঐক্য। দ্বিতীয়ত, যন্তর মন্তরের প্রতিবাদের পর ছাত্রদের মধ্যে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া সাধারণ ক্ষোভ। তৃতীয়ত, গত ১২ মাসে এবিভিপি ইউনিয়নের আমলে মুসলিম ও দলিত পড়ুয়াদের উপর হিংসা, ফি বৃদ্ধি এবং ছাত্রবিরোধী নীতির মতো বিষয়গুলি ছাত্ররা দেখেছে। তাই তারা একটি ভালো ইউনিয়ন চেয়েছে।
প্রশ্ন: বিজেপি দেশের বড় অংশে নির্বাচনী আধিপত্য ধরে রেখেছে। ছাত্র রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন? বাম ও এসএফআইয়ের কাছে এর অর্থ কী?
দিলশাদা: বিজেপি ও আরএসএস কৌশলে আমাদের ক্যাম্পাসের গেরুয়াকরণ করছে। শিক্ষার কেন্দ্রীকরণ হচ্ছে। নিয়োগের মতো প্রশাসনিক বিষয়েও তারা সরাসরি জড়িয়ে পড়ছে। ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়দের সাসপেন্ড করা হয়েছে। রোহিত তার একটি উদাহরণ (২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি দলিত গবেষক রোহিত ভেমুলার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়েছিল হস্টেল থেকে)। আমার বিশ্বাস, যা-ই হোক, বামেদের টিকে থাকতেই হবে। আমরা এই ক্যাম্পাসে ছিলাম, আছি এবং থাকবও। ক্যাম্পাস ও দেশে ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব।
প্রশ্ন: পশ্চিমবঙ্গে বহু বছর ধরে এসএফআই ছাত্র রাজনীতিতে ক্ষমতার বাইরে। হায়দরাবাদের এই জয় কি দেখাচ্ছে যে তরুণদের কাছে এসএফআই আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে?
দিলশাদা: আমরা দেখিয়েছি, এবিভিপি বা যে কোনও ফ্যাসিস্ট শক্তিকে হারানো কঠিন নয়। যন্তর মন্তরেও আমরা আমাদের শক্তি দেখিয়েছি। আমার মনে হয়, এই জয় দেশের আন্দোলনরত ছাত্রদের অনুপ্রেরণা দেবে। এসএফআই কখনও প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। কারণ আমরা জিতি বা হারি, সবসময় মাঠে ছিলাম।
প্রশ্ন: হায়দরাবাদের মতো ক্যাম্পাসে এবিভিপিকে হারানো গেলে, ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির বিরুদ্ধে বাম জোট কি সাফল্য পাবে?
দিলশাদা: আমরা পারি এবং পারবই। সব দুর্গই এক সময় ভেঙেছে। বিশ্বের কোনও ফ্যাসিস্ট শাসনই চিরস্থায়ী হয়নি। ঐক্যবদ্ধ মানুষ সবসময় জয়ী হবে।
প্রশ্ন: বাংলার কোন রাজনীতিক আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেন?
দিলশাদা: আমি তো কেরলের মেয়ে। তবে জ্যোতি বসু বরাবরই আমার অনুপ্রেরণা।
প্রশ্ন: বাংলার কোন এসএফআই নেতাদের সঙ্গে আপনি সবচেয়ে বেশি কথা বলেন?
দিলশাদা: হায়দরাবাদের কমরেডদের মাধ্যমে বাংলার কমরেডদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ রয়েছে। তাঁরা আমাকে বিরাট সমর্থন দিয়েছেন।
প্রশ্ন: নির্বাচন শেষ। একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পেলেন?
দিলশাদা: বিশ্রামের সময় নেই। ইউনিয়ন প্রশাসন ও এবিভিপির বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ ডাকা হয়েছিল, সেখান থেকেই আমি উত্তর দিচ্ছি। খুব ভোরে, রাত তিনটে নাগাদ এবিভিপির লোকজন গণনাকক্ষে ঢুকে হইচই শুরু করে। পরাজয় তারা মেনে নিতে পারেনি। প্রশাসনও নির্বাচন কমিটির সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে সাংস্কৃতিক সম্পাদকের চূড়ান্ত ফল আটকে রেখেছিল।
হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে এবিভিপির বক্তব্য-
হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের বিদায়ী সভাপতি শিবা পালেপুর দাবি, তাঁদের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ হয়েছে এবং ভোটের হারও বেড়েছে। তাঁর বক্তব্য, পাঁচটি সংগঠন একজোট হয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে লড়েছে। তাঁর আরও অভিযোগ, তৃতীয় জোটের কয়েকটি সংগঠন দুটি পদে এসএফআই-সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দিয়েছে।
পুনর্গণনার দাবি নিয়ে শিবার বক্তব্য, লিংডো কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ভোটের ব্যবধান এক শতাংশের কম হলে পুনর্গণনা করা যেতে পারে। কিন্তু উপাচার্য ও ডিন সেই প্রক্রিয়ায় না গিয়েই বিজয়ী ঘোষণা করেছেন।
