
শর্মিষ্ঠা চক্রবর্তী: আজ আক্ষরিক অর্থেই নীল রঙে মিশে গেছে লাল! আজ রাজপথ বেগুনি রঙাদের দখলে! ওঁরা রোদে পোড়েন, জলে ভেজেন, রোগীর সেবায় নিজের হাতে তাঁদের বর্জ্য পরিষ্কারও করেন। কোভিডের মতো মারণরোগেও তাঁদের ঝাঁপিয়ে পড়ার ছবি ভোলেনি বাংলা। বন্যা-বিধ্বস্ত গ্রামের প্রত্যন্ত গলিতে ভেলায় ভেসে টিকা দিতেও দেখা গিয়েছে তাঁদের। বাংলায় এই গর্বের ছবি তৈরি করেছেন তাঁরাই, আজ সেই তাঁরাই দেখালেন রাজ্যের বিপন্নতা! নিজের ন্যায্য পাওনাটুকু পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলনে চালিয়েছেন তাঁরা। আজ তাঁদের তারিখ দেওয়া হয়েছিল। আজ, বুধবার তাঁদের সঙ্গে কথা বলার আশ্বাস দিয়েছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতরের সচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগম। আশা নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েকশো মাইল উজিয়ে আসেন শহরের পথে। কিন্তু কথা তো দূর, তাঁরা পৌঁছতেই পারলেন না, ক্ষোভ আছড়ে পড়ল শহরের প্রাণকেন্দ্রের বুকে।
তাঁরা পান না অনেক কিছু! সারা দিনরাত এক করে খাটার পর হাতে পান ৫ হাজার ২৫০ টাকা। যে টাকা তাঁদের সংসাসের চাল নুন কেনার গার্হস্থ্য অনুশাসনেই শেষ হয়ে যায়। তাহলে বাচ্চাদের পড়া, যাঁর স্বামী বিছানায় পড়ে, কিংবা বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মার চিকিৎসার খরচ… দুর্মূল্যের বাজারে কীভাবে এতদিন ম্যানেজ করেছেন তাঁরা, সেটা কেবল তাঁরাই বলতে পারবেন! প্রত্যেক দিনের আলাদা করে চ্যালেঞ্জ, এ অভিজ্ঞতা কখনও দ্বিতীয় জন ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবেন না!
এবার আসা যাক, তাঁরা কী পান! তাঁদের পাওয়া কথা বছরে দুটো শাড়ি। রাজ্য সরকারের দুটো শাড়ি দেওয়ার কথা। কিন্তু আশাকর্মীরাই বলছেন, বছরে দুটো কী! তাঁরা হয়তো তিন বছরে দুটো শাড়ি পেয়েছেন। এক আশাকর্মী এসেছেন বর্ধমান থেকে, TV9 বাংলাকে বললেন, “২৩ সালে জয়েন করেছি, এখনও পর্যন্ত দুটো শাড়ি পেয়েছি। বছরে দুটো করে শাড়ি দেওয়ার কথা। কিন্তু সেটাও আমাদের দেওয়া হয় না। আমি তো একবারই পেয়েছি। ছাতার কাপড়ের থেকেও খারাপ! সেই শাড়ি পরেই রোদ-জলে ঘুরে বেড়াই। আশা তো রাখছি, আমাদের আন্দোলন সারা ফেলবে।”
তাঁর পাশেই ছিলেন আরেক আশাকর্মী। তিনি স্পষ্ট করে বললেন, তাঁদের আসলে কী কী পান না! তিনি বলেন, “বছরে আমাদের দুটো করেই শাড়ি পাওয়ার কথা। কিন্তু বছরে তো নই, আমরা দু’বারই শাড়ি পেয়েছি। সে শাড়ি পরার যোগ্য নয়, এতটাই মোটা, গরমকালে আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। আমাদের ভাতা লাগবে না। আমরা ১৫ হাজার বেতন চাই। সরকারি ছুটি চাই। আমরা যখন প্রেগনেন্ট হই, আমরা দেড় মাসের ছুটি পাচ্ছি। আমরা মায়েদের বলি তিন মাস রেস্টে থাকুন, আর সেখানে আমরা পাই ৪৫ দিন বিশ্রাম।”
২০০৫ সালে জাতীয় গ্রামীণ স্বাস্থ্য মিশন (NRHM) এর অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক দ্বারা নিয়োগ করা শুরু হয়েছিল আশাকর্মীদের। আশাকর্মীদের বেগুনি রঙের শাড়ি-সালোয়ার ইউনিফর্ম হিসাবে নির্ধারণ করে রাজ্য সরকার। সেই বেগুনি রং, আশাকর্মীদের বেগুনি রঙের শাড়ি মূলত নারীর মর্যাদা, সুবিচার, সমতা এবং আন্দোলনের প্রতীক, সেটাকেই তুলে ধরেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী! পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার নারী দিবসের গুরুত্ব এবং নারী আন্দোলনের প্রতীক হিসাবেই আশাকর্মীদের জন্য এই পোশাক দিয়েছিলেন।
আজ সেই নারীশক্তি রাজপথ দখল করল! সল্টলেকের কলেজ মোড় থেকে স্বাস্থ্যভবন কিংবা শিয়ালদহ স্টেশন, থিকথিকে বেগুনি রং আর যে রং তাড়া করে ফিরছে প্রশাসনকে। বেগুনি রং দেখেই পথ আটকেছে পুলিশ। সকাল থেকে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা-যাঁরা ভোর রাত থাকতে নিজেদের পাওনাটুকু বুঝতে এসেছিলেন শহরে, তাঁরা পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি, ব্যারিকেড টপকানোর ব্যর্থ চেষ্টা, হুড়োহুড়িতে ক্লান্ত। দিনের শেষে বাক্যিহারা দু’চোখ তাঁদের তুলে ধরল সেই না-পাওয়াকেই।