
বছর ২৫ আগের এমনই এক জানুয়ারি। আতঙ্কে ফাঁকা হতে শুরু করেছিল গোটা শিলিগুড়ি শহর। জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছিলেন বহু মানুষ। পরপর মৃত্যু। কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছিলেন না। ডাক্তাররা নাম দিয়েছিলেন ‘শিলিগুড়ি ফিভার’। সেই আতঙ্কই আবার ফিরছে বাংলায়! নবান্ন থেকে প্রেস কনফারেন্স করে জানানো হল, বাংলায় নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন দুজন। অবস্থা ক্রিটিক্যাল। তবে আতঙ্ক নয়, এই মুহূর্তে সতর্ক থাকাটাই সবথেকে বেশি জরুরি। এই মুহূর্তে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে।
বাংলায় কারা আক্রান্ত? কেমন আছেন?
উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের হাসপাতালে কর্মরত ওই দুই নার্স। গত কয়েকদিন ধরে এক বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি আছেন তাঁরা। তাঁদের মধ্যে একজনের বাড়ি নদিয়ায় ও অপরজনের বাড়ি বর্ধমানের কাটোয়ায়। পূর্ব বর্ধমান, উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদিয়ায় কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং-এর কাজ চলছে। কাটোয়ার বাসিন্দা ওই নার্স কিছুদিন আগেই গ্রামের বাড়িতে ফিরেছিলেন। হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ায় ডাক্তারের কাছেও গিয়েছিলেন।
শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করলে কতদিন লাগে বুঝতে?
চিকিৎসকরা বলছেন, শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করলে ৪ থেকে ১৪ দিন লেগে যায় উপসর্গ বুঝতে। ড. সুবর্ণ গোস্বামী জানিয়েছেন, সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমণ বোঝার কোনও উপায় নেই।
কী কী উপসর্গ দেখলে বুঝবেন নিপা আক্রান্ত?
-জ্বর
-গা হাতে পায়ে ব্যাথা
-মাথা ব্যাথা
–বমি বমি ভাব
-গলা ব্যাথা
-খিঁচুনি
-অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
-শ্বাসকষ্ট
-মাথা ঠিকমতো কাজ করে না
মৃত্যুর হার কত?
মৃত্যুর হার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন স্নায়ুতন্ত্র ফেল করলে বিপদ ক্রমশ বাড়ে।
কী থেকে সতর্ক থাকবেন?
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, বাদুড় থেকেই ছড়ায় এই ভাইরাস। তাই বাদুড় যা কিছু খায়, তা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। মূলত উঁচু গাছের ফল খেয়ে থাকে বাদুড়। সেই তালিকায় আছে লিচু, খেঁজুর, তাল। তবে এই শীতকালে যেটা থেকে সতর্ক থাকতে হবে, তা হল খেঁজুরের রস। শীতে বাংলার গ্রামে গ্রামে খুবই জনপ্রিয় এই রস। ঢাকা না থাকলে এতে বাদুড় মুখ দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাই খেতে চাইলেও ফুটিয়ে খাওয়ার কথাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই রোগ তো ছোঁয়াচে, মানুষ থেকে মানুষের শরীরে কীভাবে ছড়ায়?
ড. শুভ্রজ্যোতি ভৌমিক জানাচ্ছেন, মানব শরীরের ফ্লুইডের মাধ্যমে ছড়ায় এই ভাইরাস। অর্থাৎ সর্দি-কাশি হলে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি থাকে।
জ্বর হলেই কি নিপা, কখন পরীক্ষা করাবেন?
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আশপাশে গাছপালা বেশি থাকলে, জঙ্গল এলাকা থাকলে, সেখানকার মানুষের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
ওষুধ বা ভ্যাক্সিন কি আছে?
ওষুধ নেই। কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসা ব্যবস্থাও নেই। ভ্যাক্সিন নিয়ে কাজ হচ্ছে ঠিকই তবে তা খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে। অক্সফোর্ডে এই ভ্যাক্সিন তৈরির কথা জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত কোনও ভ্যাক্সিন তৈরি হয়নি।
এর আগে বাংলায় কখনও নিপা হয়েছে?
প্রথম বাংলাতেই ধরা পড়েছিল নিপা ভাইরাস। ২০০১ সালে শিলিগুড়ি ফিভারের কথা বলেছিলাম, সেটাই নাকি ভারতের প্রথম চিহ্নিত হওয়া নিপা ভাইরাস। সেই সময় নামটা কেউ জানতেন না। প্রায় ৫ বছর পর জানা যায় সেটা ছিল আদতে নিপা। এক মাসে প্রায় ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। পরে নদিয়াতেও একই ভাবে নিপা সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল। এবার ঠিক কোথা থেকে সংক্রমণ ছড়াল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে সিঁদুরে মেঘ দেখছে প্রশাসন।
বাংলায় নিপা নিয়ে কী পদক্ষেপ করছে প্রশাসন?
মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী ও স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগম সাংবাদিক বৈঠক করে জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতিতে নজরদারি বাড়িয়েছে স্বাস্থ্য দফতর। মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে পুরো পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন।
শুধু রাজ্য সরকার নয়, রীতিমতো সতর্ক কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন জে পি নাড্ডা। কেন্দ্রের তরফে রাজ্যে টিমও পাঠানো হচ্ছে।
চালু করা হয়েছে হেল্পলাইন নম্বরও। নম্বরগুলি হল- ৯৮৭৪৭০৮৮৫৮, ৯৮৩৬০৪৬২১২, ০৩৩২৩৩৩০১৮০। কোনও অসুস্থতা অনুভব করলে এই নম্বরগুলিতে যোগাযোগ করতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, সতর্ক থাকাটাই এখন সবথেকে বেশি দরকার।