
বৃহস্পতিবার সকালেও ঠিক ছিল শুক্রবারই দার্জিলিংয়ের লোকভবনে যাচ্ছেন। যাচ্ছেন বাংলার রাজ্য়পাল হিসাবে। আসছেন খোদ দেশের রাষ্ট্রপতি। কিন্তু রাতের মধ্যে যেন ঘেঁটে গেল সব অঙ্ক। ভোটমুখী বাংলায় একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে এল খবরটা। আর বাংলার রাজ্যপালের দায়িত্বে থাকছেন না সিভি আনন্দ বোস। নিজেই ছেড়েছেন পদ। খবরটা শুনে আর পাঁচটা সাধারণ মানুষ যেমন স্তম্ভিত হয়েছিল তেমনই স্তম্ভিত হয়েছিলেন খোদ মমতাই। স্পষ্ট লিখলেন, “আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তাঁর পদত্যাগের প্রকৃত কারণ আমার জানা নেই।” খুঁজলেন রাজনীতির অঙ্ক। এরইমধ্যে আবার শোনা গেল বাংলার নতুন রাজ্যপাল হচ্ছেন আরএন রবি। তাঁকে তামিলনাড়ু থেকে একেবারে সরিয়ে আনা হচ্ছে বাংলায়। দুই রাজ্যেই ভোট। কিন্তু উত্তাপটা যেন একটু বেশি বাংলাতেই। আর সেই হিটেই একেবারে ‘সুপারহিট’ আনন্দ বিদায়ের খবর। টি-২০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সুঞ্জুর ইনিংসে ভর করে ভারত যখন সবে ফাইনালের রাস্তা পাকা করছে তখনই জানা গেল তাঁর বাংলার ইনিংস শেষ করছেন বোস। কিন্তু মধুরেণ সমাপয়েৎ?
মধুরেণ সমাপয়েৎ?
বাংলায় প্রবাদ আছে সব ভাল যার শেষ ভাল! কিন্তু শেষটা কী ভাল হল বোসের? উত্তর খুঁজতে গিয়ে ভ্রু কিন্তু কিঞ্চিৎ কুঞ্চিতই হচ্ছে ওয়াকিবহাল মহলের। বাংলার রাজ্যপাল হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বোসের সঙ্গে রাজ্য সরকারের সম্পর্কটা কিন্তু ছিল একেবারে দেখার মতো। ধনকড় পর্বের তিক্ততা ভুলে মমতাও নতুন রসায়ন তৈরিতে ব্যস্ত। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কাটল তাল। ফের একবার ১৬ পয়েন্টের সংবাদ শিরোনামে রাজ্য-রাজ্যপাল সংঘাত। তোপ পাল্টা তোপ, আঘাত-প্রত্যাঘাত, রাজ্য-রাজনীতির একাধিক ইস্যুতে নবান্ন-রাজভবন সংঘাত যখন পুরোদমে চলছে তখন চব্বিশের মাঝামাঝি এল একেবারে শোরগোল ফেলে দেওয়া খবরটা। শ্লীলতাহানির অভিযোগ সিভি আনন্দ বোসের বিরুদ্ধে। অভিযোগ করলেন রাজভবনেরই এক অস্থায়ী কর্মী। যেন বোমা ফাটল বঙ্গ রাজনীতির আঙিনায়। আওয়াজ শোনা গেল দিল্লিতেও। পুলিশে অভিযোগ দায়ের হলেও সংবিধানের ৩৬১ অনুসারে কোনও ফৌজদারি পদক্ষেপ করা গেল না রাজ্যপালের বিরুদ্ধে।
তারপর যদিও গঙ্গা দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। মুর্শিদাবাদে হিংসার ঘটনা হোক বা গণধর্ষণের অভিযোগে উত্তাল দুর্গাপুর, সব জায়গাতেই ছুটলেন রাজ্যপাল। প্রশ্ন তুললেন রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা থেকে নারী নিরাপত্তা নিয়ে। তবে ছেড়ে কথা বলেনি তৃণমূলও। বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সেই শ্লীলতাহানির অভিযোগ। এবার পদ ছাড়তেই সেই তা নিয়ে ফের চর্চা তুঙ্গে।
ভোঁতা হবে তৃণমূলের ‘অস্ত্র’?
আনন্দ বোসের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার জল গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। সেখানেই সংবিধানের ৩৬১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে রাজ্যপালকে দেওয়া বিশেষ রক্ষাকবচকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়। আবেদনকারীর প্রশ্ন ছিল, শ্লীলতাহানির মতো কাজ কি কখনওই রাজ্যপালের ‘দাফতরিক কর্তব্যের’ অংশ হতে পারে? এই মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও, অভিযোগকারিণী পরে জানিয়েছিলেন তিনি মামলাটি প্রত্যাহার করবেন না, তবে সেটি নিয়ে আর এগোবেনও না। ওয়াকিবহাল মহলের অনেকেই মনে করছেন, কেস বেশি দূর না এগোলেও ততদিনে তৃণমূলের কাছে এই ইস্যু একেবারে বড়সড় ‘রাজনৈতিক অস্ত্র’ হয়ে উঠেছে। এই ইস্যু টেনেই বোসকে বারবার নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টাও হয়েছে পুরোদমে। যা বিতর্ক, জল্পনার আড়ালে প্রকারন্তরে তা রাজভবনের ভাবমূর্তিকেও কালিমালিপ্ত করতে থাকে। তাই বোসের অস্বস্তি কাটাতেই তাঁকে সরানোর সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই।
বাংলায় এবার রবির কিরণ?
অন্যদিকে বাংলার নতুন রাজ্যপাল হিসাবে যিনি দায়িত্ব নিচ্ছেন সেই আরএন রবি আবার কেন্দ্রীয় মহলে পরিচিত এক প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হিসাবেই। কেন্দ্রীয় প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেছেন। ভারতের ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সাল থেকে তিনি তামিলনাড়ুর ১৫তম ও বর্তমান রাজ্যপাল। স্ট্যালিন সরকারের সঙ্গে তাঁর বারবার সংঘাতের রেশ পৌঁছেছে দিল্লিতেও। এবার সেই কড়া ধাতের প্রশাসককে বাংলায় আনা কী তাহলে পূর্ব পরিকল্পিত নাকি রুটিন বদলি? জল্পনা চলছেই।
অনুপ্রবেশ নিয়ে তৃণমূলকে কাঠগড়ায় তুলে বিজেপির ধারালো আক্রমণের মাধেই এসআইআর নিয়ে উত্তাল হয়েছে বাংলা। বাংলা-সহ ১২ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর চললেও সব চোখ যেন শুরু থেকেই বাংলায়। এরইমাঝে আবার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি নিয়েও জল্পনা তুঙ্গে। এখন প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক প্রশ্নে তিনি যেভাবে তামিলনাড়ু সরকারকে কোণঠাসা করেছিলেন, বাংলায় এসেও তিনি সেই একই ভূমিকা নিতে পারেন বলে মনে করছেন অনেকেই। সে কারণেই কী রাজনীতির অঙ্ক দেখছেন মমতা? প্রশ্ন রয়েই গিয়েছে।