AQI
TV9 Network
User
Sign In

By signing in or creating an account, you agree with Associated Broadcasting Company's Terms & Conditions and Privacy Policy.

মোটরসাইকেল ডায়েরিজ: পর্ব ৩৫–বাঙালির প্রিয় কার্শিয়ংয়ের কাছেই নতুন অ্যাডভেঞ্চার আর ক্যাম্পিং ডেস্টিনেশন

Motorcycle Ride: কার্শিয়ং সম্পর্কে চিন্তা করার সময় আপনার মাথায় প্রথম জিনিসটি কী আসে? চা বাগান, অর্কিড এবং পাহাড়। আমি কখনওই ভাবিনি যে কার্শিয়ংয়ের কাছে একটি জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে একটি ক্যাম্পিং ডেস্টিনেশন থাকতে পারে! হ্যাঁ, কার্শিয়ংয়ের কাছে একটি নতুন অ্যাডভেঞ্চার এবং ক্যাম্পিং ডেস্টিনেশন রয়েছে।

মোটরসাইকেল ডায়েরিজ: পর্ব ৩৫–বাঙালির প্রিয় কার্শিয়ংয়ের কাছেই নতুন অ্যাডভেঞ্চার আর ক্যাম্পিং ডেস্টিনেশন
| Updated on: Jan 21, 2024 | 8:45 AM
Share

আমরা অনেকেই বলে থাকি বাঙালির ঘুরতে যাওয়ার স্থান শুধু দার্জিলিং। আমার মনে হয় দার্জিলিংয়ে এখনও বেশ কিছু স্থান আছে, যেখানে এখনও বাঙালি সেভাবে পৌঁছয়নি। এখনও বেশ কিছু গ্রাম আছে, যেখানে পৃথিবীর নানা বৈচিত্র খুব সহজভাবে ফুটে ওঠে। আর এই বৈচিত্র কখনওই সহজ ভাবে দেখা যায় না। তাই আপনাকে গ্রামে থাকতে হবে; আর বাইকের সঙ্গে পায়ে হেঁটেও ঘুরতে হবে। কারণ এই পৃথিবী সহজভাবে কিছু দেখায় না। এই পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় রূপ দেখার জন্য আপনাকে একটি নির্জন জায়গায় যেতেই হবে। তাই চলুন, আজকের এই পর্বে পশ্চিমবঙ্গের ছোট্ট একটা অফবিট জায়গায় ঘুরে আসি। যেখানে আপনি পাবেন প্রকৃতির গভীর অরণ্যের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নদী, আর দু’পাশে বড়-বড় পাহাড়ের মাঝে একটি ছোট্ট উপত্যকা। আর থাকছে এখানে দিগন্ত বিস্তৃত প্রাচীন চা বাগান। আর পাবেন এই গভীর জঙ্গলে নানা পাখির আওয়াজ, রাতে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। আর দিনের বেলা নানা রঙ বেরঙের প্রজাপতি এবং রাতে জোনাকির আলো।

কার্শিয়াং সম্পর্কে চিন্তা করার সময় আপনার মাথায় প্রথম জিনিসটি কী আসে? চা বাগান, অর্কিড এবং পাহাড়। আমি কখনওই ভাবিনি যে কার্শিয়ংয়ের কাছে একটি জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে একটি ক্যাম্পিং ডেস্টিনেশন থাকতে পারে! হ্যাঁ, কার্শিয়ংয়ের কাছে একটি নতুন অ্যাডভেঞ্চার এবং ক্যাম্পিং ডেস্টিনেশন রয়েছে। সিপোয়ধুরা টি গার্ডেন জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত। জঙ্গল ক্যাম্প হল একটি নির্জন ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড, যেখানে সঠিক পরিমাণে অ্যাডভেঞ্চার, বনের পথ, প্রকৃতি এবং চা বাগান রয়েছে।

এখানে অনেক ধরনের মনোরঞ্জনের উপাদানই রয়েছ, যা আপনি উপভোগ করতে পারেন। জায়গাটির আশপাশে অসংখ্য হাইকিং ট্রেইল রয়েছে, যার বেশিরভাগই চা বাগানের মধ্য দিয়ে। তাই আপনার হাইকিং জুতো খুবই দরকার। একটি পথ বেছে নিয়ে অন্য হাইকারদের সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটতে পারেন। কিছু রাস্তা বেশ মনোরম, আবার কিছু-কিছু আছে যেগুলো কঠিন রাস্তার মধ্য দিয়ে যায়, যা বৃষ্টির কারণে তৈরি হয়েছে। উপত্যকায় নদীতে একটি হাইকিং ট্রেইল আছে। চা বাগানের মাধ্যমে এটিও বেশ সুন্দর। আপনি যদি একদিনের ট্রেকিং এবং হাইকিংয়ের পরে ক্লান্ত হয়ে যান, তবে আপনি সন্ধ্যায় ক্যাম্প ফায়ার এবং বারবিকিউ উপভোগ করতে পারেন। জঙ্গল ক্যাম্পের অন্যান্য কাজ আছে। আপনি গ্রামের জৈব খামার দেখতে পারেন, এছাড়াও আপনি গ্রামে তৈরি স্থানীয় ফলের ওয়াইনের স্বাদ নিতে পারেন। বেশ ভাল স্বাদ তার। আপনি যদি সত্যিই কিছু ভাল ফলের ওয়াইনের স্বাদ নিতে চান, তবে আপনাকে রিনছেনপং-এর আজিং ফার্ম ঘুরে দেখার পরামর্শ দেব। চলুন, আর দেরি না করে তবে হাতে মাত্র চারটে দিন সময় নিয়ে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ি এই ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে।

সঙ্গে একটি ছোট ব্যাগ প্যাক নিয়ে নিন। দু’সেট জামাপ্যান্ট। একটি গরম জামাপ্যান্টের সেট, যা রাতে লাগতে পারে। কিছু শুকনো খাবার, কিছু এনার্জি বার, কিছু সাধারণ ওষুধ, আপনার অতিপ্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী। আর এক লিটারের জলের বোতল আর ক্যামেরা। যেহেতু আনুমানিক ৬১০ কিলোমিটারের রাস্তা (এক দিকের), তাই আরেকটি ছোট ব্যাগে ক্লাচ ও এক্সিলেটর কেবল, স্পার প্লাগ (এক সেট), পাংচার কিট আর একটি ছোট ডিজিটাল এয়ার পাম্প এবং এডজাস্টেবল রেঞ্জ ও স্প্যানার। রাতেই বাইকের সঙ্গে বাঞ্জিকড দিয়ে বেঁধে রাখুন এই সামগ্রী। এগুলো সাধারণত দরকার হয় না, কিন্তু ইমার্জেন্সির সময়ে নিজের কাছে থাকা অত্যন্ত জরুরি।

ভোরের শান্ত কলকাতাকে গুডবাই বলে NH2 ধরে সোজা চলে আসুন ডানকুনি, সিঙ্গুর হয়ে শক্তিগড়। এখানে আপনি সকালের খাবার খেয়ে সময় নষ্ট না করে চলে আসুন সাগরদিঘী-রঘুনাথগঞ্জ-ফারাক্কা-কালিয়াচক হয়ে মালদহ। এরপর রায়গঞ্জ, ডালখোলা, কিশান্গঞ্জ হয়ে ইসলামপুর এবং সবশেষে শিলিগুড়ি। রাস্তা এখন বেশ ভাল; বেঙ্গল টু বেঙ্গল রোড না ধরে আপনি NH ধরে আসতে পারেন। আগের মতো সেই যানজট হয় না। শিলিগুড়িতে পৌঁছতে আপনার প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যাবে; তাই এখানকার কোনও হোটেলে রাত কাটিয়ে সকালে বেরিয়ে পড়ুন সিপাহিধুরা জঙ্গল ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। শিলিগুড়ি থেকে দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার; তাই সকাল-সকাল না বেরিয়ে ব্রেকফাস্ট করে আরাম করে আসতে পারেন এখানে।

রাস্তার উপর মার্গারেটস হোপ এবং সিপাহীধুরার একটি সবুজ সাইন বোর্ড রয়েছে। এর ঠিক পাশে, আপনি ইকোপ্যালেসের সাইন বোর্ড দেখতে পাবেন। ওখান থেকে শুরু হয় খুবই এলোমেলো ও কাঁচা রাস্তা, যা প্রথমে একটি গ্রামের মধ্য দিয়ে এবং পরে চা বাগানের মধ্য দিয়ে যায়। রাস্তাটি শেষ পর্যন্ত ইকো প্যালেসের আরেকটি সাইনবোর্ডের কাছে শেষ হয়েছে। বাইক শুধুমাত্র এই পয়েন্ট পর্যন্ত আসতে পারে। সেখান থেকে আপনাকে কয়েক মিনিটের জন্য বনের পথ দিয়ে ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডে যেতে হবে। একটা ছোট বাঁশের সেতু আছে, যেটা আমি পার হয়ে অবশেষে গন্তব্যে স্থানে পৌঁছলাম।

ব্যাগপত্র রেখে একটু ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম আশপাশের জঙ্গল এবং ক্যাম সাইট উপভোগ করতে। নুড়ি-পাথর কুড়িয়ে তারপরে একটির পর একটি করে উঁচু করে রাখা, জঙ্গলের মাঝে পাখির আওয়াজ, আর বয়ে চলা নদীর শব্দে আপনি হারিয়ে যাবেন। এই গভীর অরণ্যে যখন-তখন বৃষ্টি নেমেই থাকে। তার ফলে এই সরু পাথরের রাস্তাটি হয়ে ওঠে পিচ্ছিল। পরে আমি গ্রামটি ঘুরে দেখেছি, সবজির খামার এবং বাগান পরিদর্শন করেছি। কাছেই একটা কমলালেবুর বাগান রয়েছে। সেখানে পৌঁছতে আপনাকে প্রায় ১৫ মিনিট ট্রেক করতে হবে। আর হ্যাঁ, এই ট্রেকের মধ্য দিয়ে পৌঁছে যাবেন প্রকৃতির এক্কেবারে কাছে। আর একটা কথা মাথায় রাখা খুবই দরকার দার্জিলিংয়ের নানা পাহাড় এবং জঙ্গলে জোঁকের খুব উপদ্রব। তাই একটু দেখে-বুঝে, সাবধানে পা ফেলবেন। তারপর দুপুরের নাগাদ ফিরে খাওয়া শেষ করে একটু বিশ্রাম নেওয়ার পরে সন্ধের ক্যাম্পফায়ার, গান, জঙ্গলের মাঝে গভীর অরণ্যে পশু-পাখির ডাক এবং জোনাকির আওয়াজে বেশ ভালই রাতটা কেটে গেল। পরের দিন সকালে ভোরবেলা উঠে আপনি চাইলে বাড়ি ফিরতে পারেন, যা ৬০০ কিলোমিটারের রাস্তা আশা করি একদিনে কলকাতায় পৌঁছে যাবেন। আর তা না করে আপনি ঘুরে আসতে পারেন সিটং, লাৎপঞ্চার, মাংপুরের মতো সুন্দর ছোট-ছোট গ্রাম; সবই আপনার সময়ের উপর। এই গ্রামগুলোর সৌন্দর্য এবং বৈচিত্র ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাই আজও বারবার যখনই সময় পাই, দার্জিলিংয়ের এইসব গ্রামগুলিতে ঘুরে আসি। শীত এবং বর্ষায় এসব গ্রামের বৈচিত্র অন্যরকম। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই গ্রামগুলিও নিজেকে পরিবর্তন করে কখনও কঠোর, কখনও আবার আবার সুন্দর।

Follow Us