নজর দোষ: কু-দৃষ্টি নাকি কল্পনা? মনস্তত্ত্ব বলছে…
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী ঈর্ষা বা হিংসার দৃষ্টি থেকে এক ধরনের নেতিবাচক শক্তি বেরিয়ে আসে, যা অন্যের সুখ-সমৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে। ভারতে একে বলা হয় ‘নজর’, পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের কিছু অংশে পরিচিত ‘ইভিল আই’ নামে। বাঁচার জন্য তুরস্কে নীল পুঁতির তাবিজ, আর আমাদের এখানে শিশুদের কপালে কালো টিপ পড়ানো হয়।

কারও বাড়ি থেকে ফিরেই বাচ্চার জ্বর। নতুন গাড়ি কেনার দুদিনের মধ্যেই আঁচড়। ব্যবসা ভালো চলতে চলতেই হঠাৎ মন্দা। তখনই ফিসফাস—“নজর লেগেছে!” এই ‘নজর দোষ’ শব্দটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এতটাই ঢুকে গিয়েছে যে, অঘটনের সহজ ব্যাখ্যা যেন এটিই। কিন্তু প্রশ্ন হল, সত্যিই কি কারও চোখের দৃষ্টিতে অন্যের ক্ষতি হতে পারে? নাকি এই বিশ্বাসের পেছনে আছে অন্য কারণ?
নজর দোষ কী?
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী ঈর্ষা বা হিংসার দৃষ্টি থেকে এক ধরনের নেতিবাচক শক্তি বেরিয়ে আসে, যা অন্যের সুখ-সমৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে। ভারতে একে বলা হয় ‘নজর’, পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের কিছু অংশে পরিচিত ‘ইভিল আই’ নামে। বাঁচার জন্য তুরস্কে নীল পুঁতির তাবিজ, আর আমাদের এখানে শিশুদের কপালে কালো টিপ পরানো হয়।
ঐতিহাসিকদের মতে, প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতাতেও কু-দৃষ্টির ধারণা ছিল। সমাজে ঈর্ষা ছিল একটি বড় ভয়—আর সেই ভয় থেকেই জন্ম নেয় এই ধারণা।
হঠাৎ অসুস্থতা, ছোট শিশুর অকারণ কান্না, কাজের ব্যর্থতা, বাড়িতে অশান্তি – এসবই নজর দোষের লক্ষণ হিসেবে প্রচলিত। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এগুলোর বেশিরভাগই মানসিক চাপ, শারীরিক ক্লান্তি বা বাস্তব সমস্যার ফল।
গ্রাম হোক বা শহর, এখনও অনেকেই নুন-জল দিয়ে স্নান, লেবু-লঙ্কা ঝোলানো, কালো সুতো পরানো বা সন্ধ্যায় ধুনো জ্বালানোর মতো বেশ কিছু নিয়ম মানেন নজর দোষ কাটানোর জন্য। তবে এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ স্পষ্ট নয়, কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা ‘প্লাসিবো প্রভাব’-এর কথা বলেন- বিশ্বাস থেকেই মানসিক স্বস্তি আসে, আর সেই স্বস্তি শরীরেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মনস্তত্ত্ব বলছে, মানুষ অনিশ্চয়তাকে ভয় পায়। হঠাৎ খারাপ কিছু ঘটলে তার ব্যাখ্যা খোঁজে। “নজর লেগেছে” বলা অনেক সময় নিজের ভেতরের উদ্বেগকে বাইরের কিছুর ওপর চাপিয়ে দেওয়া। এতে সাময়িক সান্ত্বনা মেলে, কিন্তু সমস্যার মূল কারণ থেকেই যায়। নজর দোষ বিশ্বাস করবেন কি না, তা ব্যক্তিগত বিষয়। তবে দীর্ঘদিন অসুস্থতা বা সমস্যায় ভুগলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ অনেক সময় কু-দৃষ্টি নয়, আমাদের নিজের চাপ আর ভয়ই আসল সমস্যার কারণ হতে পারে।
