
শিব মানেই মঙ্গল, শিব মানেই কল্যাণ। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাত হল ‘মহাশিবরাত্রি’। ফাল্গুণ মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। কিন্তু কেন এই রাতটিকে ‘মহা’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়? এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে একাধিক রোমাঞ্চকর এবং শিক্ষামূলক পৌরাণিক কাহিনি।
মহাশিবরাত্রির সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনি হল শিব ও শক্তির মিলন। দীর্ঘ কঠোর তপস্যার পর এই বিশেষ রজনীতেই হিমালয় কন্যা পার্বতী মহাদেবকে স্বামী হিসেবে লাভ করেছিলেন। বৈরাগী শিব ও সাংসারিক পার্বতীর এই বিয়ে আসলে আধ্যাত্মিক জগতের এক অনন্য সন্ধিক্ষণ। এটি প্রতীকীভাবে আমাদের বোঝায় যে, জগতের সৃষ্টির জন্য চেতনা (শিব) এবং শক্তি বা প্রকৃতির (পার্বতী) একত্র হওয়া অপরিহার্য। তাই আজও অবিবাহিত মেয়েরা এবং বিবাহিত মহিলারা সুখী দাম্পত্যের কামনায় এই রাতে শিব-পার্বতীর আরাধনা করেন।
অন্য একটি জনপ্রিয় কাহিনী অনুসারে, সমুদ্র মন্থনের সময় যখন মারণ বিষ ‘হলাহল’ উঠে আসে, তখন দেব-দানবসহ গোটা সৃষ্টি ধ্বংসের মুখে পড়ে। পৃথিবীকে রক্ষা করতে সেই ভয়ংকর বিষ স্বেচ্ছায় পান করেন দেবাদিদেব। বিষের জ্বালায় তাঁর কণ্ঠ নীল হয়ে যায়, যার ফলে তিনি ‘নীলকণ্ঠ’ নামে পরিচিত হন। মনে করা হয়, শিবের শরীরের সেই তীব্র জ্বালা প্রশমিত করতেই ভক্তরা সারা রাত জেগে তাঁকে শীতল জল ও দুগ্ধ দিয়ে অভিষেক করেন। এই কাহিনীটি আমাদের শেখায়— অন্যের মঙ্গলের জন্য কষ্ট সহ্য করাই হলো প্রকৃত দেবত্ব।
পুরাণ মতে, এদিনই ভগবান শিব তাঁর ‘লিঙ্গ’ রূপে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা এবং পালনকর্তা বিষ্ণুর মধ্যে যখন শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই চরমে পৌঁছায়, তখন তাঁদের সামনে এক বিশাল অগ্নিনির্ভ শিখা বা ‘জ্যোতির্লিঙ্গ’ আবির্ভূত হয়। ব্রহ্মা ও বিষ্ণু দুজনেই এই শিখার আদি ও অন্ত খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন এবং স্বীকার করেন যে মহাদেবই আদি ও অনন্ত। সেই জ্যোতির্ময় আবির্ভাবের স্মৃতিতেই এই রাতটি উদযাপিত হয়।
জনশ্রুতি আছে, এক ব্যাধ বা শিকারি বনের মধ্যে পথ হারিয়ে একটি বেলগাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সারা রাত জেগে অজান্তেই তিনি একটি করে বেলপাতা নিচে ফেলতে থাকেন। গাছের নিচে থাকা একটি শিবলিঙ্গের ওপর সেই পাতাগুলো পড়তে থাকে। শিকারির সেই অনিচ্ছাকৃত ‘বেলপাতা দান’ এবং ‘জাগরণ’-এ তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাঁকে দর্শন দেন। এই কাহিনীটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি আমাদের শেখায় যে, ভক্তি ও নিষ্ঠা থাকলে অজান্তেই পরমেশ্বরের কৃপা লাভ করা সম্ভব।
মহাশিবরাত্রি কেবল আচার-অনুষ্ঠানের রাত নয়, এটি নিজের ভেতরের অন্ধকারকে জয় করার এবং অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার রাত। সারা রাত জেগে জপ ও ধ্যানের মাধ্যমে ভক্তরা নিজেদের কুপ্রবৃত্তিগুলো শিবের চরণে অর্পণ করে এক নতুন আধ্যাত্মিক জীবন শুরু করার শপথ নেন।