
অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরার রাত, দেবাদিদেব মহাদেব ও আদ্যাশক্তি দেবী পার্বতীর মিলনের রাত— মহাশিবরাত্রি। হিন্দু মহাপুরাণ, বিশেষত শিবমহাপুরাণ অনুসারে, এই তিথিটি সৃষ্টির গূঢ় রহস্যে ঘেরা। লোকবিশ্বাস ও শাস্ত্রীয় মতানুসারে, এই পবিত্র রজনীতেই শিব তাঁর সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের ‘মহা তাণ্ডব’ নৃত্যে মগ্ন হয়েছিলেন। একইসঙ্গে এই রাতটি শিব ও শক্তির সেই চিরন্তন মহামিলনের সাক্ষী, যা জগৎসংসারে চেতনা (পুরুষ) ও প্রকৃতিকে (শক্তি) একসূত্রে গেঁথেছে।
সাধারণভাবে মনে করা হয়, শিবরাত্রি মানেই কুমারী মেয়েদের শিবের মতো আদর্শ স্বামী পাওয়ার ব্রত। কিন্তু শাস্ত্রের গভীরে গেলে দেখা যায়, এর তাৎপর্য আরও গভীর। মহাদেব হলেন পরম পুরুষ বা মহাজাগতিক মননশীলতার প্রতীক, আর মা পার্বতী হলেন প্রকৃতি বা আদিশক্তির রূপ। এই দুইয়ের মিলনেই সৃষ্টির পূর্ণতা। তাই এদিন কেবল নারীরাই নন, পুরুষদের কাছেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নারীরা যেমন সুখী দাম্পত্য ও শিবের মতো শান্ত-গম্ভীর জীবনসঙ্গী প্রার্থনা করেন, পুরুষেরা তেমন মহাশক্তির আশীর্বাদ ও জীবনের মোক্ষ অর্জনে উপাসনা করেন।
মহাশিবরাত্রির মূল ভিত্তি হলো সংযম ও ভক্তি। ভক্তরা সারাদিন ও সারারাত নির্জলা বা ফলমূল খেয়ে উপবাস পালন করেন। বিশ্বের প্রতিটি শিবমন্দিরে এদিন মন্ত্রোচ্চারণে মুখরিত হয় আকাশ-বাতাস। তবে শিবলিঙ্গে জল বা দুধ অর্পণের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ শাস্ত্রীয় বিধান রয়েছে, শিবলিঙ্গ স্নান করানোর জন্য মূলত গঙ্গাজল বা গঙ্গাজল মিশ্রিত শুদ্ধ বারি ব্যবহার করা হয়। অনেকেই দুধ, মধু বা দই দিয়েও অভিষেক করেন।
বেলপাতা অর্পণের সঠিক নিয়ম: শিবের পুজোয় তিনটি পাতাযুক্ত বেলপাতা বা ‘ত্রিদল’ অপরিহার্য। তবে মনে রাখবেন, বেলপাতার প্রতিটি পত্রের নিচে থাকা বৃন্ত বা বোঁটার কাছের শক্ত মোটা অংশটি অবশ্যই ভেঙে বাদ দিতে হবে। ছেঁড়া বা ফুটো থাকা বেলপাতা মহাদেবকে অর্পণ করা শাস্ত্রবিরুদ্ধ। এই সামান্য খুঁটিনাটি মেনে চলাই হল নিষ্ঠার পরিচয়।
মহাশিবরাত্রির রাতকে বলা হয় ‘কালরাত্রি’। মনে করা হয়, এই রাতে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে মানুষের শরীরের শক্তি প্রাকৃতিকভাবেই ঊর্ধ্বমুখী হয়। তাই সারা রাত জেগে (জাগরণ) ভগবান শিবের মন্ত্রোচ্চারণ করলে আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটে এবং জীবনের অন্তিমে ‘মোক্ষ’ বা পরম মুক্তি লাভ করা সম্ভব হয়। ভক্তি, বিশ্বাস আর সমর্পণের এই মহাশিবরাত্রি কেবল একটি উৎসব নয়, এটি নিজের ভেতরের পশুত্বকে বিসর্জন দিয়ে শিবত্বকে জাগিয়ে তোলার এক পরম সুযোগ।