
বর্ধমান: মহালয়ার (Mahalaya) পরদিনই পুজোর (Durga Puja 2026) আবহ বর্ধমানে। ঢাকঢোল, ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র আর ভক্তদের উচ্ছ্বাসে মুখরিত সর্বমঙ্গলা মন্দির চত্বর। শতাব্দীপ্রাচীন রীতি মেনে কৃষ্ণসায়র থেকে রূপোর ঘটে জল ভরে আনা হল দেবী সর্বমঙ্গলার মন্দিরে (Sarbamongola Temple)। সুসজ্জিত শোভাযাত্রার মাধ্যমে মায়ের ঘট নিয়ে আসা হয়। আর সেই ঘট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই রাঢ়বঙ্গে দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা হল। বর্ধমানের ঐতিহ্যবাহী সর্বমঙ্গলা মন্দিরের দুর্গাপুজো ঘিরে প্রতি বছরের মতো এবারও ভক্তদের মধ্যে উৎসাহ তুঙ্গে।
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, মহালয়ার পরের দিন বর্ধমানের ঐতিহাসিক কৃষ্ণসায়রের চাঁদনি ঘাট থেকে দেবী সর্বমঙ্গলার ঘট উত্তোলন করা হয়। রূপোর ঘটে জল ভরে রথে চাপিয়ে সুসজ্জিত শোভাযাত্রার মাধ্যমে মন্দিরে নিয়ে আসা হয়। শোভাযাত্রায় শামিল হন অসংখ্য ভক্ত। ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের তালে মায়ের ঘট নিয়ে মন্দিরে পৌঁছন তাঁরা। এরপর নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেই ঘট প্রতিষ্ঠা করা হয়।
দীর্ঘদিনের এই প্রথা অনুযায়ী, ঘট প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়েই বর্ধমান শহরে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। নবমী পর্যন্ত চলবে দেবী সর্বমঙ্গলার বিশেষ পুজো। এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু এবং প্রতিমন্ত্রী মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র। মায়ের ঘট উত্তোলনকে কেন্দ্র করে মন্দির চত্বরে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়।
বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৭০২ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচাঁদ এই মন্দির নির্মাণ করান। তবে মন্দিরের আরাধ্যা দেবী সর্বমঙ্গলার মূর্তিটি আরও প্রাচীন বলে মনে করা হয়।দেবীমূর্তির বয়স নিয়ে অবশ্য নানা মত রয়েছে। কারও মতে, মূর্তিটি প্রায় এক হাজার বছরের পুরনো। আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী, মূর্তিটির বয়স প্রায় দু’হাজার বছর। যদিও মূর্তিটির প্রকৃত বয়স নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
সর্বমঙ্গলা মন্দিরে দেবী পূজিত হন অষ্টাদশভুজা সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী রূপে। কষ্টিপাথরের তৈরি দেবীমূর্তিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ৮ ইঞ্চি। দেবীর এই বিশেষ রূপ দর্শন করতে বছরভর বহু ভক্ত মন্দিরে আসেন। তবে দুর্গাপুজোর সময় মন্দিরের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
দেবী সর্বমঙ্গলার মূর্তিকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে একাধিক লোককাহিনি। কথিত আছে, একসময় বর্ধমানের বাহিরসর্বমঙ্গলা এলাকায় জেলেদের জালে উঠে এসেছিল অদ্ভুত দর্শন একটি পাথর। প্রথমে সেটির গুরুত্ব কেউ বুঝতে পারেননি। পরে এক পুরোহিত বুঝতে পারেন, পাথরটি আসলে দেবীমূর্তি।
আরও একটি প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ওই পাথরটি দামোদর নদ সংলগ্ন একটি চুন তৈরির কারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে শামুকের খোলের সঙ্গে সেটিকে পোড়ানো হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মূর্তিটির কোনও ক্ষতি হয়নি বলে লোকশ্রুতি রয়েছে।
এরপর বর্ধমানের তৎকালীন রাজা স্বপ্নাদেশ পান বলে কথিত আছে। সেই স্বপ্নাদেশ মেনেই দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। শুরু হয় দেবী সর্বমঙ্গলার আরাধনা। সেই থেকে বর্ধমানের মানুষের বিশ্বাস ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই মন্দির।
বর্ধমানের রাজপরিবারের সঙ্গে সর্বমঙ্গলা মন্দিরের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। একসময় রাজপরিবারের তত্ত্বাবধানেই মন্দিরের পুজো ও অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠান পরিচালিত হত। পরবর্তী সময়ে জমিদারি প্রথার অবসান হলে মন্দির পরিচালনার জন্য পৃথক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
১৯৫৯ সালে বর্ধমানের তৎকালীন মহারাজা উদয়চাঁদ একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন। মূলত মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ, পুজোর আয়োজন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্যই এই বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বর্তমানে সেই ট্রাস্টি বোর্ডের হাতেই মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে।