
ঝাড়গ্রাম: অষ্টমীর গভীর রাত। চারদিক নিস্তব্ধ। মন্দিরের রান্নাঘরে রাখা পাঁঠার মাংস, মশলা আর উনুনে তিনটি কাঠ। মন্ত্রপাঠ সেরে রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে আসেন পুরোহিত। চাবি পৌঁছে যায় রাজপরিবারের হাতে। তারপর? জনশ্রুতি, সেই বন্ধ রান্নাঘরেই নাকি স্বয়ং মা দুর্গা নিজের হাতে রান্না করেন ভোগ! শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এমনই লোকবিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে ঝাড়গ্রামের (Jhargram Durga Puja 2026) চিল্কিগড়ের কনক দুর্গা মন্দিরকে (Kanak Durga Temple) ঘিরে। ডুলুং নদীর তীরে জঙ্গলে ঘেরা এই প্রাচীন মন্দিরে মহাষ্টমীর দিন তাই ভক্তদের ভিড় চোখে পড়ার মতো।
ঝাড়গ্রামের চিল্কিগড়ের কনক দুর্গা মন্দিরের ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো। এখানে দেবী দুর্গার রূপও আর পাঁচটা মন্দিরের থেকে একেবারে আলাদা। দশভুজা সিংহবাহিনী রূপে নয়, দেবী এখানে চতুর্ভুজা অশ্বারোহিণী। অর্থাৎ, চার হাতে ঘোড়ার পিঠে অধিষ্ঠিত মা কনক দুর্গা।
প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে সামন্ত রাজা গোপীনাথ সিং স্বপ্নাদেশ পান। সেই স্বপ্নাদেশ মেনেই রানির হাতের সোনার কাঁকন গলিয়ে তৈরি করা হয় দেবীর মূর্তি। সোনার তৈরি বলেই দেবীর নাম হয় কনক দুর্গা। তবে সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় সেই বহুমূল্য মূর্তি। কথিত আছে, ১৯৬০ সালে এবং পরবর্তী সময়ে দেবীর প্রাচীন মূর্তি চুরির ঘটনা ঘটে। বর্তমানে মন্দিরে অষ্টধাতুর মূর্তিতেই পূজিত হন দেবী।
এই মন্দিরের সবচেয়ে রহস্যময় প্রথা হল ‘বিরাম ভোগ’। স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মহাষ্টমীর গভীর রাতে স্বয়ং দেবী কনক দুর্গা নিজের ভোগ রান্না করেন। আর সেই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এক বিশেষ রীতি।
মহাষ্টমীর রাতে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত পাঁঠার মাংসে মশলা মাখিয়ে শালপাতায় মুড়ে রাখেন। এরপর উনুনে তিনটি কাঠ দিয়ে তার উপর খুন্তি চাপিয়ে দেন। বীজমন্ত্র পাঠ করে রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে আসেন পুরোহিত। সেই ঘরের চাবি পৌঁছে দেওয়া হয় চিল্কিগড় রাজপরিবারের কাছে।
এরপর সারা রাত বন্ধ থাকে রান্নাঘরের দরজা। জনশ্রুতি, সেই নিঝুম রাতেই নাকি স্বয়ং দেবী নিজের হাতে ভোগ রান্না করেন। পরদিন সকালে রাজপরিবারের সদস্যরা এসে রান্নাঘরের দরজা খোলেন। সেই বিশেষ প্রসাদ দিয়েই শুরু হয় নবমীর পুজো। এই ভোগই ‘বিরাম ভোগ’ নামে পরিচিত।
তবে দেবীর নিজের হাতে ভোগ রান্নার বিষয়টি সম্পূর্ণ লোকবিশ্বাস ও প্রচলিত কাহিনির অংশ। এর কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কিন্তু ভক্তদের কাছে এই রীতির মাহাত্ম্য অপরিসীম।
শুধু বিরাম ভোগই নয়, কনক দুর্গা মন্দিরের নিত্যভোগেও রয়েছে বিশেষত্ব। প্রতিদিন দেবীকে নিবেদন করা হয় ‘গঞ্জ ভোগ’। তাতে ভাত, ডাল, সবজির পাশাপাশি থাকে হাঁসের ডিম ও মাছের তরকারি।
তবে মহাষ্টমীর দিন দেবীর ভোগের আয়োজন একেবারে আলাদা। এদিন মায়ের পাতে দেওয়া হয় সুগন্ধি পোলাও, নানা রকম ভাজা, তরকারি, বিভিন্ন ধরনের পিঠে এবং খাঁটি দুধের পায়েস। বিশেষ যত্নে তৈরি করা হয় দেবীর এই ভোগ।
ডুলুং নদীর তীরে সবুজে ঘেরা চিল্কিগড়ের কনক দুর্গা মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, জঙ্গলমহলের ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন। দেবীর অশ্বারোহিণী রূপ, রাজপরিবারের সঙ্গে মন্দিরের সম্পর্ক এবং বিরাম ভোগের রহস্যময় প্রথা এই পুজোকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।