
সালটা ১৮৮৬, আগস্ট মাস। কাশীপুর উদ্যানবাটীতে তখন মরণপণ রোগের সঙ্গে লড়াই করছেন যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ। চারদিকে গভীর শোকের ছায়া। কিন্তু সেই শারীরিক যন্ত্রণার মাঝেই রচিত হচ্ছিল এক আধ্যাত্মিক ইতিহাস। মহাপ্রয়াণের মাত্র কয়েকদিন আগে প্রিয় শিষ্য নরেন্দ্রনাথের হাতে তাঁর সমস্ত আধ্যাত্মিক শক্তি অর্পণ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন ঠাকুর। যা রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দকে নিয়ে যেকোনও আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
কী ঘটেছিল রামকৃষ্ণর মৃত্যুর ঠিক আগে?
মৃত্যুর মাত্র তিন-চার দিন আগের কথা। একদিন শ্রীরামকৃষ্ণ নরেনকে নিজের কাছে ডাকলেন। নরেন গুরুর সামনে বসতেই ঠাকুর তাঁর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন এবং গভীর সমাধিতে মগ্ন হলেন। নরেন্দ্রনাথ অনুভব করলেন, তাঁর শরীরের ভেতর যেন এক প্রবল বিদ্যুৎপ্রবাহ প্রবেশ করছে। কিছুক্ষণ পর যখন ঠাকুরের সমাধি ভাঙল, দেখা গেল তাঁর অশ্রুধারা। গদগদ কণ্ঠে শ্রীরামকৃষ্ণ নরেনকে বললেন— “আজ তোকে সব দিয়ে আমি ফকির হলাম। এই শক্তিতে তুই জগতের অনেক কাজ করবি, কাজ শেষ হলে তবে ফিরে যাবি।”
নরেন্দ্রনাথের মনে তখনও সংশয় ছিল। তিনি মনে মনে ভাবছিলেন, এই চরম শারীরিক কষ্টের সময় ঠাকুর যদি নিজেকে ভগবান বলে ঘোষণা করতে পারেন, তবেই তিনি বিশ্বাস করবেন। অন্তর্যামী শ্রীরামকৃষ্ণ শিষ্যের মনের কথা বুঝতে পেরে শেষবারের মতো বলে ওঠেন— “যে রাম, যে কৃষ্ণ, সেই এবার এই শরীরে রামকৃষ্ণ— তবে তোর বেদান্তের মতে নয়।” অর্থাৎ তিনি বুঝিয়ে দিলেন, তাঁর স্থূল শরীরটি অসুস্থ হলেও তাঁর ভেতরের পরমাত্মা অবিনশ্বর।
শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের সম্পর্ক ছিল আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ শিখরে। ঠাকুর জানতেন, তাঁর অপূর্ণ কাজ পূর্ণ করবেন এই নরেনই। তাই মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর প্রিয় শিষ্যকে কেবল শক্তিতেই নয়, একটি পরিবার বা সংঘ গড়ে তোলার দায়িত্বও দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি অন্যান্য শিষ্যদের দেখিয়ে নরেনকে বলেছিলেন, “এদের দেখিস।” এই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ বা ‘রামকৃষ্ণ মঠ’-এর বীজ।