
কলকাতা : বেশি নয়, বছর পাঁচেক পিছিয়ে যান। ২০২০-র শেষে ভারতীয় দলের অস্ট্রেলিয়া ট্যুর। অ্যাডিলেডে প্রথম টেস্টে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬ রানে অল আউট হয়ে গেল ভারত। গোটা দেশ জুড়ে নিন্দার ঝড়। কিভাবে একটা দল প্রথম ইনিংসে প্রায় আড়াইশো রান তোলার পরেও দ্বিতীয় ইনিংসে এইভাবে অসহায় আত্মসমর্পণ করে? ঠিক তার তিন সপ্তাহের মধ্যেই বদলে গেল দৃশ্যটা। সেই ঐতিহাসিক গাব্বা টেস্ট ! ঋষভ পন্থের ঝোড়ো ৮৯ রানের দাপটে সেই ম্যাচ জিতে গাব্বার অজি অহঙ্কারকে দর্পচূর্ণ করল রাহানের ভারত। মনে রাখতে হবে, প্রথম টেস্টের পর দেশে ফিরেছিলেন অধিনায়ক বিরাট কোহলি। দায়িত্ব সামলেছিলেন অজিঙ্ক রাহানে। তাঁর নিজের ফর্ম না হয় বাদ দিই, কিন্তু তাঁর অধিনায়কত্বের কথা ভুলি কিভাবে ?
কাট টু, আইপিএল ২০২৬। প্রায় তিন সপ্তাহ হয়ে গেলেও একটি ম্যাচেও জয় পায়নি তাঁর দল কলকাতা নাইট রাইডার্স। ৬ ম্যাচ খেলে ৫ হার, একটি ম্যাচ বৃষ্টির জন্য বাতিল। ১ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্টস টেবলের শেষ স্থানে আসীন নাইটরা। কিন্তু কেন হঠাৎ এই দুর্ভাগ্য? ঠিক কোন জায়গায় ভুল করছে কেকেআর?
হিসেব বলছে, আইপিএল শুরু হওয়ার আগেই মুস্তাফিজুরের দল থেকে বাদ পড়ে যাওয়া ও হর্ষিত রানার বিদায় প্রবল মানসিক ধাক্কা দিয়েছে দলকে। যতই হোক, হর্ষিতের সাম্প্রতিক টি-টোয়েন্টি ফর্মের দিকে তাকালে তাঁর উপর ভরসা করতেই পারত কেকেআর কিন্তু কপাল এমনই, হর্ষিত না থাকায় শুরুতেই এক পায়ে প্লাস্টার বেঁধে নামতে হচ্ছে নাইটদের। বৈভব অরোরার উপর দলের বোলিং ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব থাকলেও তিনি যে সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ, ৬ ম্যাচ ধরে তাঁর পারফরম্যান্স দেখে বুঝে গিয়েছেন সমর্থকরা। শুধু বৈভব কেন, অনুকূল রায়, কার্তিক ত্যাগী, সুনীল নারিন, বরুন চক্রবর্তীর অবস্থাও তথৈবচ। উইকেট পাচ্ছেন না বরুন। রান কম দিলেও উইকেট দরকার, সেখানেই স্পিন বিভাগ সম্পূর্ণ অচল। ব্লেসিং মুজারাবানি ৪ উইকেট পেলেও যে দলে থাকবেন, সেই বিষয়ে কোনও গ্যারান্টি দিতে পারছে না দল। ফলত, ব্যাটে রান উঠলেও বোলিং বিভাগের অভিজ্ঞতার মূল্য চোকাচ্ছে কেকেআর।
ক্যাপ্টেন রাহানের নিজের ফর্মও যে খুব ভাল, বলা যায় না। ৬ ম্যাচে করেছেন মাত্র ১৫২ রান। সর্বোচ্চ? মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে ৬৭। কেউ কেউ বলছেন, রাহানের উপরে অধিনায়কত্বের চাপ পড়ে যাওয়ায় তাঁর ব্যাটিং ব্যর্থ হচ্ছে। প্রশ্ন হল, এই একই কাজ বছরের পর বছর এই আইপিএলে করে এসেছেন তাঁর স্বদেশী বিরাট কোহলি, মহেন্দ্র সিংহ ধোনি, রোহিত শর্মারা। কই, তাঁদের তো এতটা অসহায় দেখায়নি? নাকি নিজের জন্য দল চেয়েও পাচ্ছেন না রাহানে? আগের ম্যাচের পর কোচ অভিষেক নায়ারের সঙ্গে তাঁর আলোচনা এতটাই ভাইরাল হয়েছিল, কেউ কেউ বলছিলেন আইপিএলের অধিনায়কত্ব থেকে বিদায় ঘটে গেল মুম্বইকরের। কিন্তু, যদি সেই পরিস্থিতি আসে, তাহলে দলের ক্যাপ্টেন হবেন কে? রিঙ্কু সিং? তাঁর নিজেরই তো ফর্ম নেই।
পরবর্তী সমস্যা, ক্যামেরন গ্রিন। ২৫ কোটির প্রাইস ট্যাগ তাঁর ঘাড়ে এমনভাবে ঝুলছে, একটু ব্যর্থ হলেই খাঁড়ার কোপের মতো পড়তে পারে। ৬ ম্যাচে রান করেছেন মাত্র ১৩৫। গড় মাত্র সাড়ে ২২। এর মধ্যে ৭৯ রানই এসেছে গুজরাট ম্যাচে। তাঁর ব্যাট সেদিন না চললে কোনোমতেই ১৮০ তুলতে পারে না কলকাতা। প্রথম তিন ম্যাচে বোলিং না করলেও লখনৌ ম্যাচে তাঁর শেষ ওভারেই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন অনামী মুকুল চৌধুরী। ফলে, গ্রিনের ২৫ কোটি টাকা যে জলে, এই ফর্ম দেখলে এর থেকে ভাল কিছু মনে হচ্ছে না।
আজ বিকেলে ইডেন গার্ডেন্সে রাজস্থান রয়্যালসের বিরুদ্ধে নামবেন রাহানেরা। তার আগেই দলে এতো সমস্যা। কোন যুক্তিতে আইপিএল জেতানোর পরেও ক্যাপ্টেন শ্রেয়স আইয়ার, মিচেল স্টার্ক বাদ পড়ে যান, বোধগম্য হয় না। তবে আজ বৈভবদের আটকাতে গেলে যে অতিমানবিক পারফরম্যান্স করতে হবে নাইটদের, এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এই মুহূর্তে কেকেআরের যা অবস্থা, বাকি ৮ ম্যাচেই বড় ব্যবধানে জয় পেতে হবে। একটি ম্যাচে পয়েন্ট নষ্ট করলেই প্লে অফ নামক সিঁড়ি থেকে পা হড়কানোর সম্ভাবনা প্রবল। সেই অদৃশ্য আগুনের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন নাইট অধিনায়ক। ২০২০ থেকে ২০২৬, ৬ বছরেই কতটা বদলে গিয়েছে তাঁর জীবনের গতিপথ। মিস্টার রাহানে, সময় যে এতটাই নির্মম!