
ধূপগুড়ি: উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন। যাত্রীদের ভিড়। ট্রেনের আনাগোনা লেগেই রয়েছে। স্টেশনের বিভিন্ন প্রান্তে সিসিটিভি-ও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু, খোঁজ নিতে গিয়েই চক্ষু চড়কগাছ। সিসিটিভি-গুলির বেশিরভাগ বিকল। জলপাইগুড়ির ধূপগুড়ি রেলস্টেশনে বেশিরভাগ সিসিটিভি বিকল থাকার কারণ কী? উঠছে প্রশ্ন। চোরাচালানকারীদের সুবিধা করে দিতেই সিসিটিভি বিকল করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।
চোরাচালানের অন্যতম করিডর হিসেবে উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ রেলস্টেশন ধূপগুড়িকে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ। ব্রাউন সুগার, নেপালি সুপারি, গাঁজা থেকে শুরু করে নারী পাচারের মতো অপরাধে বিভিন্ন সময়ে স্টেশন ও সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। উদ্ধার হয়েছে মাদক দ্রব্য। গ্রেফতারও হয়েছে অভিযুক্তেরা। অথচ সেই গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনের নিরাপত্তার জন্য বসানো ২৭টি সিসিটিভি ক্যামেরার মধ্যে অধিকাংশই দীর্ঘ ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগ। ফলে প্রশ্নের মুখে রেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পাশাপাশি রেলযাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, চোরাকারবারিদের সুবিধা করে দিতেই কি ক্যামেরাগুলি এখনও সচল করা হচ্ছে না? যদিও ইচ্ছাকৃতভাবে ক্যামেরা অচল করে রাখার অভিযোগের পক্ষে কোনও প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি।
সূত্রের খবর, ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর ধূপগুড়ি রেলস্টেশনে মোট ২৭টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। যাত্রী নিরাপত্তা জোরদার করা এবং স্টেশন চত্বরে নজরদারি বাড়ানোর জন্যই ক্যামেরাগুলি বসানো হয়। এর মধ্যে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে ৯টি, দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে ৪টি এবং স্টেশনের ভিতরে থাকা ফ্লাইওভারের উপর নজরদারির জন্য ৫টি ক্যামেরা বসানো হয়। বাকি ক্যামেরাগুলি বিভিন্ন অফিসের সামনে এবং স্টেশন চত্বরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় লাগানো রয়েছে। তবে কিছুদিন চলার পর থেকেই ক্যামেরাগুলির বেশিরভাগ বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগ। বর্তমানে অধিকাংশ ক্যামেরাই কাজ করছে না বলে সূত্রের দাবি।
ধূপগুড়ি স্টেশনকে ঘিরে চোরাচালানের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে পুলিশি অভিযানে ব্রাউন সুগার, নেপালি সুপারি এবং গাঁজা উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে। নারী পাচারের অভিযোগেও অভিযান চালিয়ে গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে এই স্টেশনে সিসিটিভি নজরদারি ব্যবস্থা সচল রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কোনও অপরাধের তদন্তে অভিযুক্তদের গতিবিধি শনাক্ত করা, যাতায়াতের পথ খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ক্যামেরার ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ ক্যামেরাই যদি বিকল থাকে, তাহলে তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজ পাওয়ার সুযোগও কমে যায়।
বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে গত শনিবার একটি ঘটনার তদন্তের সূত্র ধরে। তদন্তের প্রয়োজনে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে কয়েকজন আধিকারিক ধূপগুড়ি রেলস্টেশনে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, দীর্ঘদিন ধরেই স্টেশনের ক্যামেরাগুলি কাজ করছে না। ফলে তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ফুটেজ সংগ্রহ করা নিয়েও তৈরি হয় জটিলতা। গুরুত্বপূর্ণ একটি রেলস্টেশনে নিরাপত্তার জন্য বসানো ক্যামেরাগুলি দীর্ঘদিন অকেজো থাকার ঘটনায় রেল কর্তৃপক্ষের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সিসিটিভি ক্যামেরা শুধু নজরদারির মাধ্যম নয়, চুরি, নাশকতা, সন্দেহজনক গতিবিধি, মাদক পাচার কিংবা নারী পাচারের মতো ঘটনায় তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবেও কাজ করে। ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করা, ঘটনার সময় ও গতিপ্রকৃতি বোঝা এবং তদন্তের গতিপথ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি সচল ক্যামেরার নজরদারি অপরাধীদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি করতে পারে। ধূপগুড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে অধিকাংশ ক্যামেরা বিকল থাকায় এই সুবিধাগুলিই কার্যত ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ।
স্থানীয় বাসিন্দা নূর আলম বলেন, “বর্তমানে প্রশাসনের তরফে বিভিন্ন দোকান, বাড়ি এবং গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কারণ চুরি, নাশকতা বা যেকোনও অপরাধের তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উঠে আসে। ক্যামেরা সচল থাকলে দুষ্কৃতীরাও অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ করার আগে ভয় পায়। সেখানে ধূপগুড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশনে ২৭টি ক্যামেরার মধ্যে অধিকাংশ দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রেল দফতরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “যারা ক্যামেরাগুলি বসিয়েছিলেন এবং দেখভালের দায়িত্বে থাকা বরাতপ্রাপ্ত সংস্থা, তাঁদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ করা উচিত। স্টেশন চত্বরে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে রেল দফতর, প্রশাসন, জিআরপি এবং আরপিএফকেই সমস্যায় পড়তে হবে। তাই দ্রুত ক্যামেরাগুলি মেরামত করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার দাবি জানাচ্ছি।”
কী বলছেন স্টেশন ম্যানেজার?
ধূপগুড়ি স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মনোজ কুমার সিং বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই সিসিটিভি ক্যামেরাগুলি খারাপ রয়েছে বলে আমাদের কাছে খবর রয়েছে। যারা ক্যামেরাগুলির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁদের বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কিন্তু সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করার কারণেই ক্যামেরাগুলি অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।”
দীর্ঘ ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে ২৭টি সিসিটিভি ক্যামেরার অধিকাংশ বিকল থাকার অভিযোগ ঘিরে এখন একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। কেন এতদিনেও ক্যামেরাগুলি মেরামত করা হল না? রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংস্থার বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ করা হয়েছে? ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও কেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? পাশাপাশি ক্যামেরাগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে অচল করে রাখা হয়েছে কি না, সেই অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠছে। ধূপগুড়ি স্টেশনের যাত্রী নিরাপত্তা এবং চোরাচালান রুখতে দ্রুত অধিকাংশ বিকল ক্যামেরা সচল করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।