
জলপাইগুড়ি: রাজগঞ্জে কি বন্ধ হয়ে যাবে ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প? তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীদের লাগাতার অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হতে চলেছেন উত্তরবঙ্গের উদ্যোগপতি বিশাল আগরওয়াল। আর এই ইস্যুতেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। বিশাল আগরওয়ালের উদ্যোগে ২০২০ সালে জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জ ব্লকের বন্ধুনগরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যায়ে তৈরি করা হয়েছে টাটা সংস্থার সেলস ও সার্ভিস সেন্টার।
১২ বিঘার বেশি জমির ওপর গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান থেকে শুধুই কমার্শিয়াল ভেইকল বিক্রি করা হয় না। এখান থেকে টাটা-র তৈরি করা সামরিক বাহিনীর মিসাইল, অস্ত্র বহনকারী গাড়িগুলির যাবতীয় পরিষেবা দেওয়া হয়। ৩০০-র বেশি মানুষ কাজ করেন সেখানে। শোরুম কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, গত এক মাসের বেশি সময় ধরে এই শোরুমের জয়গা দখল করার চেষ্টা চালাচ্ছে তৃণমূল আশ্রিত কিছু দুষ্কৃতী। তারা জমিতে ঘর বানাচ্ছে, পাশাপাশি সীমানা প্রাচীর দিয়ে এলাকা ঘিরে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ, শোরুম কর্তৃপক্ষ বাধা দিতে গেলে তাদের উপর চড়াও হয় ওই দুষ্কৃতীরা। তাদের মারধরও করা হয় বলে অভিযোগ। গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এমনকী শোরুমে থাকা শতাধিক কর্মীদের তালাবন্ধ করে আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় তিন ঘণ্টা পর পুলিশ গিয়ে তালা খুলে বের করে কর্মীদের। পুলিশকে বারবার লিখিত অভিযোগ জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি বলে দাবি শোরুম কর্তৃপক্ষের।
বাধ্য হয়ে গত নভেম্বর মাসে উত্তরকন্যায় গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন বিশাল আগরওয়াল। কিন্তু তাতেও কোনও লাভ না হওয়ায় এবার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সমস্যা সমাধানের দাবি করতে চলেছে শোরুম কর্তৃপক্ষ৷
শোরুমের মালিকপক্ষের তরফে কেশব আগরওয়াল বলেন, “আমরা চিন সীমান্ত থেকে শুরু করে নর্থ ইস্টে থাকা যাবতীয় সেনাবাহিনীর গাড়ির পরিষেবা দিয়ে থাকি। সেনাবাহিনীর মিসাইল সহ বিভিন্ন ধরনের সমরাস্ত্র বহনকারী গাড়ির সার্ভিস একমাত্র আমরাই দিয়ে থাকি। আমরা অপারেশন সিঁদুরের সময়ও রাজস্থান সীমান্তের জন্য সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গাড়ির সার্ভিস করেছি। আমরা চাই শান্তিপূর্ণভাবে এই সব গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা দিতে। কিন্তু আমাদের উপরে অত্যাচার হচ্ছে। পুলিশকে জানালে যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে কীভাবে এই প্রতিষ্ঠান চলবে?” এমনকী ওই শোরুমের তিনটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ।
শিল্পপতিদের এইভাবে হয়রানি করা হলে, কী করে তারা বাংলায় ব্যবসা করবে? প্রশ্ন তুলেছেন বিশাল আগরওয়াল। তিনি বলেন, “আমরা অত্যাচারিত হয়ে বারবার ভোরের আলো থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি। কিন্তু কোনও সুরাহা হয়নি। উল্টে আমার নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমি গত নভেম্বর মাসে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি। কিন্তু লাভ হয়নি। এবার নবান্নে গিয়ে দেখা করে অভিযোগ জানানোর চেষ্টা করব। এতেও যদি কাজ না হয়, তবে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।”
যার বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ সেই রফিক হুসেনের দাবি, তাঁরই জমির একটা অংশ দখল করে টাটা-র শোরুম তৈরি করা হয়েছে। তাঁর কাছে বৈধ কাগজপত্র রয়েছে বলেও দাবি করেছেন রফিক। তিনি বলেন, “শোরুমের মালিক বিশাল আগরওয়াল শোরুম বানাতে গিয়ে আমার প্রচুর জমি দখল করে রেখেছে। আমি আইনের দ্বারস্থ হয়েছি। এই জমিতে ইনজাংশন জারি রয়েছে। যদি আমার জমিতে আমি ঢুকতে না পারি, তবে ওরাও ওই জমিতে যেতে পারবে না। তাই আমি ওই প্রতিষ্ঠানের গেটে তালা দিয়েছিলাম।” অপর এক অভিযুক্ত মহম্মদ হাসিফুল বলেন, “এই জমি আমার আত্মীয় কিনেছে। আমরা আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ শুরু করেছি। কিন্তু এখানে নির্মাণ কাজ করতে বাধা দিচ্ছে বিশাল আগরওয়ালের গুন্ডা বাহিনী। এরা আমার পরিবারের লোকদের মারধর করেছে। মহিলাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে মারধর করেছে। বাচ্চাকেও মেরেছে। আমরা পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছি।”
বিজেপির জেলা কমিটির সদস্য নিতাই মন্ডলের দাবি, জমি দখলের পিছনে রয়েছে শাসক দলের নেতাদের মদত। কাটমানির কারণেই জমি দখলের চেষ্টা করছে কিছু দুষ্কৃতী।
তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন INTTUC-র জেলা সভাপতি তপন দে বলেন, “শিল্পে বাধা আমরা বরদাস্ত করি না। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানে গন্ডগোলের বিষয়টি আমাদের কেউ জানায়নি। এখানে আমাদের বিধায়ক আছেন। যদি তৃণমূলের কেউ এইসব ঘটনায় জড়িত থাকে, তবে তিনি নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নিতেন। কিন্তু মালিকপক্ষ স্থানীয় বিধায়ককে জানায়নি। পুলিশ পুলিশের কাজ করবে।” শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার সি সুধাকর জানিয়েছেন, উভয় পক্ষ থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।