
নদিয়া: তিনিই আদতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরণের সঙ্গী! একটা আন্দোলন, যে আন্দোলন ঘুরিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন কংগ্রেস নেত্রী মমতার রাজনৈতিক ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছিল, সেই আন্দোলনের মূল সঙ্গী ছিলেন তিনি! প্রয়াত ফেলিনা বসাক। মমতার উত্তরণের নেপথ্যে রাইটার্স আন্দোলন, ২১ জুলাইয়ের ভূমিকা তো বঙ্গবাসীর পরিচিত। কিন্তু এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ফেলিনা বসাককে মানুষ খুব একটা মনে রাখেননি। তিনি সেভাবে আসেননি কখনও প্রচারের আলোয়। ১৯৯৩ সাল, সেদিন রাইটার্স অভিযান কেন হয়েছিল, তার নেপথ্যেই এই ফেলিনা বসাক। সোমবার, নদিয়ার ফুলিয়ার জীর্ণ বাড়িতেই বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু হয় তাঁর।
সালটা ১৯৯৩। ফেলিনা বসাকে মূক ও বধির মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। অভিযুক্ত প্রতিবেশী সিপিএম কর্মী। তাঁর গ্রেফতারি ও শাস্তির দাবিতে লড়াই চালিয়েছিলেন ফেলিনা। প্রথমে স্থানীয় নেতৃত্ব, তারপর তাঁর হার ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পৌঁছে যাওয়া। মমতা তখন পিভি নরসিংহ রাও সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী।
বাংলায় তখন জ্যোতি বসুর সরকার। মেয়ের ন্যায় বিচারের দাবিতে ফেলিনা মমতার সঙ্গে জ্যোতি বসুর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ অনুমতি দেয়নি। এরপর রাইটার্স অভিযান। সে ইতিহাস সকলের জানা। রাজপথ উত্তপ্ত হয়েছিল। পুলিশের গুলিতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই স্মৃতিতে এখনও শহিদ দীবস পালন করে তৃণমূল। প্রতি বছর ঘটা করে একুশে জুলাইয়ের নিমন্ত্রণের কার্ডও পৌঁছত ফেলিনার কাছে। কিন্তু ফেলিনা তাঁর মেয়ের বিচার পাননি। অভিযুক্তের শাস্তি হয়নি। ফেলিনার মেয়ে সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েছিলেন। জানা যায়, ধাপার কাছে একটি সরকারি ঘরে তিনি সন্তান প্রসব করেন। এরপর ফেলিনার মেয়েকে হোম বাড়ি পাঠায়। সন্তানের দায়িত্ব নেয় সরকার। কিন্তু অভিযুক্ত তখনও অধরা। লড়াই করতে করতে দিন যায়। ২০০৯ সালে ফেলিনার মেয়ের মৃত্যু হয় সাপের কামড়ে। এরপর সেই মামলাও থিতিয়ে পড়ে।
ফেলিনার আক্ষেপ ছিল, এই আন্দোলনই রাজ্যে পালাবদল ঘটাল। কিন্তু সরকারে আসার পর তিনি একবারও আর মুখ্যমন্ত্রী মমতার সাক্ষাৎ পাননি। এমনকি মমতা যখন শান্তিপুরে সভা করতে গিয়েছিলেন, ফেলিনা দেখা করতে গিয়েছিলেন, তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। আক্ষেপ নিয়ে দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে দিন কাটাচ্ছিলেন ফেলিনা। তৎকালীন বাম সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন, তাই মেলেনি বিপিএল কার্ড। আর সেই কার্ড না থাকায় মমতার আমলে মেলেনি বার্ধক্য ভাতাও। কোনওরকমে সুতো কেটে দিন গুজরান করতেন। বর্তমানে তাঁর ছেলের বয়স প্রায় ষাট ছুঁইছুঁই। তিনিও অসুস্থ। ছেলের বউ কোনওভাবে সংসার চালান। পরিবার সূত্রে জানা যায়, অসুস্থতার মধ্যেও তিনি চাইতেন তার শারীরিক অবস্থার খবর যেন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছয়। শেষবার মুখ্যমন্ত্রীকে দেখার ইচ্ছা থাকলেও তা আর পূরণ হয়নি। তাঁর প্রয়াণের পর দেখা করতে যান শান্তিপুর বিধানসভার তৃণমূল বিধায়ক ব্রজ কিশোর গোস্বামী।