
অশোকনগর: সরস্বতী পুজোর দিন সকালে রাস্তায় হঠাৎ সাইরেন বাজিয়ে ছুটে আসছে পাঁচ গাড়ির কনভয়। তা দেখেই চমকে গিয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গাড়ি থামতেই একেবারে ভিআইপি স্টাইলে গাড়ি থেকে নামেন এক অফিসার, সঙ্গে একাধিক নিরাপত্তারক্ষী। প্রথমে অশোকনগর বিদ্যাসাগর বাণীভবন ও পরবর্তীতে বিধানচন্দ্র বিদ্যাপীঠে চলে যান। নিজেকে ইনকাম ট্যাক্স অফিসার হিসাবে পরিচয় দেন। বাণীভবন স্কুলের প্রধান শিক্ষককে জানান, ইনকাম ট্যাক্সে চাকরি পাওয়ার কথা জানাতেই সে স্কুলে এসেছে। তাঁর হাবভাব ও নিরাপত্তারক্ষীদের বহর দেখে উপস্থিত সকলের মনেই মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
বাণীভবন স্কুলে কথাবার্তা বলার পর পরবর্তীতে অশোকনগর বিজয়া ফার্মেসী এলাকায় বিধানচন্দ্র বিদ্যাপীঠে চলে যান। সেখানে শিক্ষকদের সঙ্গে গুরুগম্ভীর আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু সন্দেহ হয় স্কুলের ইংরেজি শিক্ষকের। মাত্র ১৭ বছর বয়সে কী করে ইনকাম ট্যাক্সের এত বড় পদে সে চাকরি পেল তা ভাবায় তাঁকে। এই সন্দেহ থেকেই ওই শিক্ষক উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে অফিসারের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে শুরু করেন। আর তাতেই সামনে এসে যায় আসল ঘটনা। সাবলীল ইংরেজিতে উত্তর দেওয়া তো দূর, কেবল ‘ইয়েস’ আর ‘নো’ বলতে গিয়েই ঘাম ছুটতে থাকে ওই কিশোরের। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে পুলিশ ডাকার কথা উঠতেই স্কুল চম্পট।
পাঁচটি গাড়ির কনভয় নিয়ে এলেও শেষ পর্যন্ত তিনটি গাড়ি নিয়ে সে পালাতে সক্ষম হয় ওই কিশোর। কিন্তু বাকি দুটি গাড়ি এবং নিরাপত্তারক্ষীদের আটকে ফেলেন স্কুলের শিক্ষক ও স্থানীয় জনতা। উত্তেজনার খবর পেয়ে অশোকনগর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। দুটি গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয়। একইসঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের আটক করে থানায় নিয়ে যায়। জেরায় জানা যায়, ওই নিরাপত্তারক্ষীদের স্থানীয় একটি এজেন্সি থেকে ভাড়া করা হয়েছিল। নিরাপত্তারক্ষীরা জানাচ্ছেন সকালে ওই কিশোর জানিয়েছিল তার বাবা অফিসার, কিন্তু পরে সে নিজেই অফিসারের পরিচয় দিয়ে গাড়িতে ওঠে। যা দেখে রক্ষীদেরও সন্দেহ হয়েছিল।
যে ইংরাজির শিক্ষক ওই ছাত্রকে ধরেছিলেন সেই দেবাশিস মিত্র বলছেন, “আমি স্টাফ রুমে ঢুকি দেখি ও বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। সবাই স্যর স্যর করছে। কিন্তু আমার ওকে দেখেই সন্দেহ হয়। আমি ওকে বয়স জিজ্ঞেস করতে শুরুতেই শুরুতেই ও ভুলটা করে। বলে ১৭ বছর বয়স। আমি বলি কোন পরীক্ষা দিয়ে তুমি ১৭ বছরে ইনকাম ট্যাক্স অফিসার হলে! এরপর আমি ওর সঙ্গে ইংরাজিতে কথা বলা শুরু করি। কিন্তু তখন ও আর উত্তর দিতে পারেনি। আমার মনে হয় সমাজিকভাবে যাঁরা কোণঠাসা তাঁরা মানসিক সমস্যার জন্যই এগুিলো করে। মূলত সামাজে যাতে পাত্তা পাওয়া যায় তাই এই ধরনের কর্মকাণ্ড করে। ওরা ভাবে এমন একটা কিছু করি যাতে লোকে আমাকে হিরো ভাবে। হয়তো সরস্বতী পুজোর দিন সবাই ইমপ্রেস করতেই এমনটা করে থাকতে পারে।”
তদন্তে নেমে ওই নাবালক ও তার পরিবারকে থানায় তলব পুলিশ। তখনই একটি ইনকাম ট্যাক্স দফতরের ভুয়ো আইকার্ড উদ্ধার করে। জানা গেছে, ২০২৫ সালে নবম শ্রেণির পরীক্ষা দেওয়ার পর থেকেই আর স্কুলের পথে যায়নি ওই কিশোর। কিন্তু, আচমকা কেন নিজেকে ভুয়ো আয়কর আধিকারিক পরিচয় দিয়ে এই পরিকল্পনা করতে গেল ওই যুবককে, তা ভাবাচ্ছে পুলিশকে। সরস্বতী পুজোর দিন বিশেষ কাউকে চমক দিতে বা ইমপ্রেস করতেই এই কাণ্ড, নাকি এর পেছনে বড় কোনও ছক রয়েছে তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। যদিও ঘটনা নিয়ে কোনও কথাই বলতে রাজি নয় ওই নাবালক। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা দেখে বারবার মুখ ঢাকতে দেখা গেল তাঁকে।